শুরুর গল্প: ক্লাসরুম থেকে কারাগারের ভেতরে
কালবিনুর সিদিক ছিলেন উরুমচির একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চীনা ভাষার শিক্ষক। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ করেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাকে নতুন একটি চাকরিতে বাধ্য করে—চীনা ভাষা পড়ানো, তবে এবার একটি “পুনঃশিক্ষা কেন্দ্রে”। পুলিশের গাড়িতে চড়ে প্রতিদিন তাকে যাওয়া-আসা করতে হতো, এবং গোপনীয়তার অঙ্গীকারে সই করানো হয়েছিল।
শুরুতেই তিনি বুঝতে পারেন, এটি কোনো স্কুল নয়, বরং এক ধরনের কারাগার। তিনি দেখেছেন মানুষকে বেঁধে আনা হচ্ছে, হামাগুড়ি দিয়ে ক্লাসরুমে ঢোকানো হচ্ছে। “প্রতিদিন চিৎকার ও আর্তনাদ শুনতাম,” তিনি বলেন। “শিক্ষা নয়, এখানে ছিল নিপীড়ন।”
বন্দীরা অশিক্ষিত নয়, সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষরা
চীনা কর্তৃপক্ষ বলে আসছে, এসব শিবিরে ‘অশিক্ষিতদের’ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু সিদিকের অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলছে।
“তারা ছিলেন ডাক্তার, ব্যবসায়ী, দাতা, এমনকি বিদেশে পড়াশোনা করে ফেরা যুবক-যুবতী। তাদের কোনো পুনঃশিক্ষার দরকার ছিল না। তাদের একমাত্র অপরাধ ছিল উইঘুর হওয়া।”
নারীদের শিবিরে ভয়াবহতা
ছয় মাস পর তাকে বদলি করা হয় নারীদের শিবিরে। সেখানেই তিনি প্রথম সরাসরি দেখেন জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ।
“প্রত্যেক নারীকে বড়ি খেতে বাধ্য করা হতো, যাতে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। অবিবাহিত মেয়েদেরও রেহাই ছিল না। অনেককে অপারেশন করা হতো,” সিদিক বলেন।
তিনি বিশেষভাবে মনে রেখেছেন এক তরুণীর কথা—“সে সর্বোচ্চ ১৯ বছরের হবে। বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হলো, পরে খবর এল তার মৃত্যু হয়েছে। অতিরিক্ত বড়ির চাপেই শরীর ভেঙে পড়েছিল।”
নিজেও তিনি ভুক্তভোগী। প্রথমে তাকে আইইউডি বসানো হয়, যা রক্তক্ষরণ ও যন্ত্রণার কারণ হয়। পরে তাকে জোর করে অপারেশন করে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়। “আমি কেঁদে বলেছিলাম, আমার বয়স হয়েছে, সন্তান ধারণ সম্ভব নয়। তবুও তারা আমাকে ছাড়েনি।”
বেইজিংয়ের দাবি বনাম বাস্তবতা
চীন সরকার এখনো দাবি করে আসছে যে শিবিরগুলো ‘চরমপন্থা দমন’ এবং ‘দক্ষতা উন্নয়ন’-এর কেন্দ্র। কিন্তু অসংখ্য প্রমাণ ও সাক্ষ্য ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।
জাতিসংঘ ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শিনজিয়াংয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে এ পরিস্থিতিকে “গণহত্যা” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বেইজিং এসব অভিযোগকে “মিথ্যা প্রচারণা” বলে উড়িয়ে দিচ্ছে।
নির্বাসন ও সংগ্রাম
২০১৯ সালে কালবিনুর সিদিক অবশেষে নেদারল্যান্ডসে পৌঁছাতে সক্ষম হন। মেয়ের পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে তিনি পাসপোর্ট পান—যা উইঘুরদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
“আমি উজবেক বলেই পেরেছি। যদি উইঘুর হতাম, কখনোই পারতাম না।”
তার স্বামী, যিনি উইঘুর, চীন থেকে বের হতে পারেননি। বরং কর্তৃপক্ষ তাকে জোর করে তালাক দিতে বাধ্য করে। আজ তিনি স্বামীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখতে পারেন না।
বিদেশে এলেও হুমকি থেমে থাকেনি। চীনা পুলিশ তাকে ফোন করে বলেছিল: “চুপ থাকুন, আমরা আপনার স্বামীকে বের করে দেব। নয়তো দেশে ফিরে আসুন।” কিন্তু তিনি অস্বীকার করেন—“যা খুশি করুন, আমি নীরব থাকব না।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
কালবিনুর সিদিক এখন নেদারল্যান্ডসে আশ্রিত। তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন সংসদে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তার সাক্ষ্য বহুবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ও জাতিসংঘ অধিবেশনে আলোচিত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, সিদিকের মতো শত শত সাক্ষ্য একসঙ্গে প্রমাণ করে যে শিনজিয়াংয়ে সাংগঠনিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে।
এক শিক্ষিকার শপথ
“আমি চাকরি হারিয়েছি, স্বাস্থ্য হারিয়েছি, স্বামী ও দেশ হারিয়েছি,” তিনি বলেন। “কিন্তু আমার কণ্ঠ হারাব না।”
কালবিনুর সিদিক আজ বিশ্বের সামনে এক জীবন্ত সাক্ষ্য—যা শুধু শিনজিয়াংয়ের মুসলিমদের দুর্দশাই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিবেকেরও পরীক্ষা নিচ্ছে।

