দুর্গাপূজা ঘিরে ২৯ জেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঝুঁকি

সম্প্রীতি যাত্রার প্রতিবেদন বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মন্দির, মাজার ও সংখ্যালঘুদের ঘরে হামলার প্রবণতা বেড়েছে।

দেশব্যাপী দুর্গাপূজাকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাগরিক সংগঠন ‘সম্প্রীতি যাত্রা’।

সংগঠনটি দশ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, এবারের পূজা উপলক্ষে দেশের ২৯টি জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি জেলা—ঢাকা, রংপুর, যশোর, চাঁদপুর ও নোয়াখালী—‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং বাকি ২৪টি জেলা ‘মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য ৩৫টি জেলা আপাতত অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ধরা হয়েছে।

এক দশকের নথি ও পরিসংখ্যান

গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রীতি যাত্রা জানায়, গত এক দশকে পূজা মণ্ডপ, বিজয়া শোভাযাত্রা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার পুনরাবৃত্তির তথ্য তারা সংগ্রহ করেছে। এগুলো মূলত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার সংগঠনের নথির ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে।

গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ লিখিত বক্তব্যে জানান, হামলার শিকার কেবল হিন্দু মন্দির বা পূজা মণ্ডপ নয়; অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনাও ক্রমেই টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, “প্রথম আলো’র সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৮০টি মাজার ও দরগায় হামলা হয়েছে। পুলিশ রেকর্ড অনুযায়ী, গত আগস্ট ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত অন্তত ৪০টি মাজারে ৪৪টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।”

তিনি জানান, মাঠপর্যায়ের রিপোর্ট ও সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে ফারাক রয়েছে; সামগ্রিক চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ

গবেষক মাহা মির্জা অভিযোগ করেন, সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। “পূর্ববর্তী সরকারকেও আমরা ফ্যাসিবাদী বলেছি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। মানুষ আতঙ্কে বাস করছে। হামলা যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সরকারের দায়িত্ব ছিল এই প্রবণতা থামানো, কিন্তু তারা নীরব থেকেছে,” বলেন তিনি।

চিত্রশিল্পী অরূপ রাহী বলেন, “এটি সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিস্ট চক্রান্তেরই অংশ। সমাজে একধরনের সামাজিক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, যা ভিন্ন ধর্ম, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির স্বাধীনতাকে সংকুচিত করছে।”

লেখক ও অধিকারকর্মী বাকী বিল্লাহ মন্তব্য করেন, ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলা হলেও তা কেবল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্যই প্রযোজ্য। “অন্য ধর্মের মানুষের অনুভূতিকে কখনোই মূল্য দেওয়া হয় না। এতদিন যেসব হামলা হয়েছে, সেগুলো ভিত্তিহীন ও গুজব ছড়ানো অভিযোগের ওপর,” তিনি বলেন।

সামাজিক প্রতিরোধের ডাক

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একাংশের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও একই নীতি অনুসরণ করছে। উল্টো তাদের সময়ে মাজার ও আখড়ায় হামলা বেড়েছে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। এখন সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।”

পূজাকে ঘিরে বাড়তি শঙ্কা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হিন্দু ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা সামনে রেখে এই সতর্কবার্তা এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সরকারের উদাসীনতা ও জবাবদিহিহীনতার কারণে হামলার ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। পূজার সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

spot_img