বাংলাদেশে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীর

শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতায় ও প্রশ্রয়ে সংগঠনটি খোলাখুলি প্রচার, সমাবেশ ও নিয়োগ কার্যক্রম চালাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী সংগঠন হিযবুত তাহরীর বাংলাদেশ (এইচটিবি)।

একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের মাধ্যমে গোপনে কার্যক্রম চালালেও এখন তারা প্রকাশ্যেই সভা-সমাবেশ করছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তুলছে এবং খোলাখুলিভাবেই খিলাফতের ডাক দিচ্ছে।

পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম ভয়েসকে বলেছেন, “মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উগ্র ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে দৃশ্যত সহনশীল আচরণ করছে। সরকারের প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠছে জঙ্গি সংগঠনগুলো।”

”বহু জঙ্গিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হচ্ছে না। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের শূন্যতা পুরণ হচ্ছে উগ্রবাদের বিকাশের মাধ্যমে।”

গ্রেপ্তারকৃত ইসলামী উগ্রবাদী ও হিজবুত সদস্যদের কেউ গ্রেপ্তার হলে সে সহজেই জামিন পায়। অথচ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনদের নানা রকম হাস্যকর মামলা দিয়ে আটক করে রেখেছে ইউনুস সরকার, বলেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু, সেনাবাহিনীতে প্রবেশ

হিযবুত তাহরীর মূল সংগঠনটি ১৯৫৩ সালে জেরুজালেমে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের লক্ষ্য বৈশ্বিক খিলাফত কায়েম করা। বাংলাদেশ অধ্যায় এইচটিবি ২০০০ সালের দিকে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

পরে সংগঠনটি দ্রুত বিস্তার ঘটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, নর্থ সাউথসহ দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। মূলত মেধাবী কিন্তু পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধে হতাশ যুবকদের টার্গেট করে তাদের মধ্যে খিলাফতের স্বপ্ন ছড়িয়ে দেয় এইচটিবি।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার এ সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকার সে সময় জানায়, সংগঠনটি শান্তি ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এরপর থেকে এইচটিবি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়, তবে গোপনে ছাত্র, পেশাজীবী ও সামরিক কর্মকর্তাদের টার্গেট করে কাজ চালিয়ে যায়। ২০১২ সালে সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে জানায়, মধ্যম সারির কয়েকজন কর্মকর্তার মাধ্যমে তারা সরকার উৎখাতের চেষ্টা করেছিল, যা প্রতিহত করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের অস্থিরতায় সুযোগ

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশজুড়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়, সেটিই এইচটিবির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে। হাসিনার পতনের মাত্র দুদিন পর সংগঠনটির কর্মীরা জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাশে বিক্ষোভ করে।

তারা খোলাখুলিভাবে খিলাফতের পক্ষে লিফলেট বিতরণ করে এবং সাদা পতাকা উড়ায়। এমনকি গুলশান থানার দেয়ালেও পোস্টার লাগানো হয়, যেখানে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলায় নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।

২০২৫ সালের মার্চে ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ‘মার্চ ফর খিলাফত’-এর আয়োজন করে সংগঠনটি। শুক্রবারের জুমার নামাজ শেষে প্রায় তিন হাজার সমর্থক একত্রিত হয়ে খিলাফতের দাবি জানায়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়, সাংবাদিকরাও হামলার শিকার হন। ওই ঘটনায় ৩০ জনের বেশি কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলেও সংগঠনটির শক্তি ও জনসমাগমের সামর্থ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রশাসন ও রাজনীতিতে প্রভাব

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এইচটিবির প্রভাবশালী পর্যায়ে প্রবেশ। ২০২৪ সালের আন্দোলন-অরাজকতার সময় কারাগার ভেঙে পালানো শত শত প্রশিক্ষিত সদস্যের খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, এদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোতেও জায়গা করে নিয়েছে।

এমনকি ঢাকার সিটি করপোরেশনের একজন প্রশাসকের সঙ্গেও অতীতে এইচটিবির যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে, যা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া সংগঠনটি নারী ও কিশোরদের টার্গেট করে নতুন করে রিক্রুটমেন্ট চালাচ্ছে। উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের মধ্যেও তাদের সেল তৈরি হয়েছে।

ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো দাবি করছে, দেশে আসলে কোনো জঙ্গি নেই; সবকিছুই ছিল “নাটক”। এ ধরনের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি ঢাকার পুলিশ কমিশনার পর্যন্ত প্রকাশ্যে বলেছেন, “বাংলাদেশে সন্ত্রাসী নেই।” নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই বক্তব্যকে বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

অথচ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, তারা ৭০০-র বেশি পলাতক সদস্যের খোঁজ পাচ্ছে না।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এইচটিবি অন্যান্য সংগঠনের মতো সাধারণ অনুসারী নয়, বরং মেধাবী ও প্রতিভাবান তরুণদের আকৃষ্ট করে, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে ঢুকে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে সক্ষম। সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল ছাড়া এই হুমকি মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে হিযবুত তাহরীর যে নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সেটি দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

spot_img