গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে ইসরায়েল: জাতিসংঘ কমিশন

জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে; ইসরায়েল অভিযোগকে পক্ষপাতদুষ্ট ও ভিত্তিহীন বলেছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধীনে গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে—ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের চারটি ধারায় আওতায় পড়ে এবং এর পেছনে “গণহত্যার উদ্দেশ্য” স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

ইসরায়েল এই অভিযোগকে “পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য

কমিশনের চেয়ার নাভি পিল্লাইয়ের নেতৃত্বে প্রস্তুত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে—

  • নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা
  • গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন
  • এমন জীবনযাত্রার অবস্থা তৈরি করা যা ধ্বংস ডেকে আনে
  • জন্মহার রোধে উদ্দেশ্যমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড কেবল যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলার কৌশলের অংশ। হাসপাতাল, স্কুল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের উদাহরণও এতে তুলে ধরা হয়েছে।

আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

এই প্রতিবেদন আইনি রায় নয়, তবে আন্তর্জাতিক আদালত (ICJ)-এ চলমান দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলায় এটি প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিমধ্যে আদালত কিছু অন্তর্বর্তী নির্দেশনা দিয়েছে।

গণহত্যা সনদ অনুযায়ী, কোনো জাতিগত, ধর্মীয় বা জাতীয় গোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত কর্মকাণ্ডই গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। কমিশনের দাবি—ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড এই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে—

“এই কমিশন বহু আগেই নিরপেক্ষতার ভান ত্যাগ করেছে। এর সিদ্ধান্ত পূর্বনির্ধারিত, পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ এবং ম্যান্ডেট রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।”

তেল আবিবের দাবি, গাজায় তাদের অভিযান হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ, যারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে ১,২০০ জনকে হত্যা ও শতাধিককে জিম্মি করেছিল। বেসামরিক হতাহতের ঘটনা “অনিচ্ছাকৃত” এবং যুদ্ধের বাস্তবতা বলে তারা উল্লেখ করেছে।

প্যালেস্টাইনের প্রতিক্রিয়া

প্যালেস্টাইনি কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে—যেমন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধ।

গাজা শাসনকারী হামাসও প্রতিবেদনের প্রশংসা করেছে, যদিও তাদের ভাষ্য অনেক দেশের কাছে উসকানিমূলক বলে বিবেচিত।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

  • মানবাধিকার সংস্থা: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অবিলম্বে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
  • পশ্চিমা দেশ: যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ প্রতিবেদনের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে, তবে ইসরায়েলকে সংযমের আহ্বান জানিয়েছে।
  • আরব ও মুসলিম দেশ: অনেকেই প্রতিবেদনের প্রশংসা করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমন্বিত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের আহ্বান জানিয়েছে।

গাজার মানবিক পরিস্থিতি

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী—

  • অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত ৩৮,০০০-এর বেশি প্যালেস্টাইনি নিহত, যাদের বেশিরভাগ নারী ও শিশু।
  • ৮০% মানুষ বাস্তুচ্যুত।
  • বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা সেবার তীব্র সংকট।
  • উত্তর গাজায় দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

কমিশনের মতে, এসব অবস্থা কেবল যুদ্ধের ফল নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ধ্বংসাত্মক কৌশলের অংশ।

পরবর্তী পদক্ষেপ

মানবাধিকার পরিষদ শিগগিরই এই প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা করবে। তবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা বড় বাধা হতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই প্রতিবেদন জনমত, আন্তর্জাতিক আদালতের মামলা এবং রাষ্ট্রগুলোর নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।

spot_img