আবারও গরীব হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ: দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৮ শতাংশে

অপশাসন, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, বেকারত্ব, গ্রামীণ আয়ের পতন ও লিঙ্গ বৈষম্য মিলিয়ে দারিদ্র্যের নতুন ফাঁদে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার আবারও বেড়ে চলেছে— ‍শুরু হয়েছে শেখ হাসিনার শাসন আমলের দীর্ঘদিনের অগ্রগতির বিপরীতমুখী যাত্রা। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।

২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। চরম দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে, যা তিন বছর আগে ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি চারজনের একজন এখন দরিদ্র আর প্রতি দশজনের একজন চরম দারিদ্র্যের শিকার।

ভঙ্গুর অগ্রগতি, গভীর সংকট

গতকাল শনিবার আয়োজিত এক অনলাইন আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই দারিদ্র্যের উল্টোদিক ঘুরে যাওয়া কেবল সাময়িক ধাক্কা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ভঙ্গুরতার প্রতিফলন। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ইমরান মাটিন বলেন, “আমাদের দারিদ্র্য হ্রাস মূলত মানুষকে দারিদ্র্যের সীমার ওপরে তুলেছে, কিন্তু স্থায়ীভাবে মুক্ত করতে পারেনি। এতে এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা যে কোনো সংকটে আবারও দরিদ্র হয়ে পড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, এখন বাংলাদেশ দ্বৈত সংকটের মুখে—একদিকে ঝুঁকিভিত্তিক ক্ষণস্থায়ী দারিদ্র্যের বৃদ্ধি, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী বা চরম দারিদ্র্যের পুনরুত্থান। এর মোকাবিলায় দরকার ভিন্নধর্মী ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতি।

কর্মসংস্থানের সংকট ও বৈষম্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। এই ‘কর্মহীনতা বৃদ্ধি’ দারিদ্র্য কমানোর পথে বড় বাধা। অসমতা বাড়ায় দারিদ্র্য দূরীকরণ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।”

তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষার খরচের প্রায় ৭০ শতাংশ বহন করছে পরিবারগুলো। ফলে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মানসম্মত শিক্ষায় প্রবেশাধিকার সংকুচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সুযোগকেও সীমিত করছে।

নীতিগত আলোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, স্থবির বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সূচকের ত্রুটি এবং জলবায়ু পরিবর্তন দারিদ্র্যকে আরও বাড়াচ্ছে। তার ভাষায়, “দেশের যুব সমাজের ৪০ শতাংশেরও বেশি এনইইটি (কাজে নেই, পড়াশোনায় নেই, প্রশিক্ষণেও নেই)। তাই টেকসই কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য হ্রাস সম্ভব নয়।”

গ্রামীণ জীবনে গভীর সংকট

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, গ্রামে দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হ্রাস, শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং গ্রামীণ অ-কৃষি আয়ের সংকোচন। তিনি বলেন, “গ্রামীণ আয়ের বড় অংশ অ-কৃষি খাত থেকে আসে। সেই প্রবাহ কমে গেছে। ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য শহরের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে।”

বেকারত্বে ভাঙা আশার স্বপ্ন

২০২৪ সালের ছাত্র-আন্দোলনের পর কোটামুক্ত কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে চাকরির সংকট আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বেকার মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখে। শিল্পখাতে কর্মসংস্থানও গত এক দশক ধরে স্থবির।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, “প্রতি বছর আড়াই মিলিয়ন গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, অথচ সুযোগ থাকে তার অর্ধেকের জন্য। বিনিয়োগহীনতা, পুঁজিপলায়ন আর দুর্বল শাসনব্যবস্থা কর্মসংস্থানের বড় বাধা।”

রাজনৈতিক সহিংসতা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগপন্থী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা বারবার হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন। গাজী গ্রুপের মালিক গোলাম দস্তগীর গাজীর গ্রেফতারের আগে ও পরে তার প্রতিষ্ঠান লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আলোড়ন তোলে।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা’ জানে আলম অপু এক শিকারোক্তিমূলক ভিডিওতে উল্লেখ করেন, সরকারের উপদেষ্টা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এসব সংগঠিত হামলা চালানো হচ্ছে। এর ফলে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, হাজারো শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।

মুদ্রাস্ফীতি ও স্থবির মজুরি

বর্ধিত জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্থবির বেতনের কারণে সাধারণ মানুষের অবস্থা আরও শোচনীয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুকুমার পোদ্দার বলেন, “২০ হাজার টাকার বেতন দিয়েও সংসার চালানো কঠিন। বাজার প্রতি সপ্তাহে বাড়ছে।” বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার কাউন্সেলর অধ্যাপক নুরুল মোমেন বলেন, “গ্র্যাজুয়েটরা বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও এমন চাকরি পাচ্ছে, যার বেতনে ন্যূনতম জীবনধারণ সম্ভব হচ্ছে না।”

পোশাক খাতের চাপ ও বৈদেশিক চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পেও ধস নেমেছে। অর্ডার কমে যাওয়ায় হাজারো শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অন্যদিকে প্রবাসী আয়ে কিছুটা সান্ত্বনা মিললেও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতের রেমিট্যান্স প্রবাহ ঝুঁকির মুখে।

সংস্কারের সীমা ও তরুণদের হতাশা

বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, বাস্তব সংস্কার ছাড়া এর সুফল আসতে সময় লাগবে। কর্মমুখী শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগ না বাড়ালে বর্তমান প্রজন্মের হতাশা কাটবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহবুব পিয়াস বলেন, “প্রতিদিন আড্ডার শেষে প্রশ্নটা একটাই—পড়াশোনা শেষ করে এখন করবটা কী?”

আওয়ামী লীগের শাসনামলে দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্যে প্রশংসিত বাংলাদেশ আজ আবারও পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ন্যায্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি না হলে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে—আর তার ভার বহন করবে তরুণ প্রজন্ম।

spot_img