বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন লোকগানের মহাসাধককে হারালো আজ। লালন গীতির মহারানী খ্যাত প্রখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন চলে গেছেন না–ফেরার দেশে। শনিবার (সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৫) রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ঢাকার ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অশীষ কুমার চক্রবর্তী সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
শেষ দিনগুলো
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন ফরিদা পারভীন। নিয়মিত সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করতে হতো। কিন্তু চলতি সেপ্টেম্বরের ২ তারিখে এক ডায়ালাইসিস সেশনের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। সেদিনই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং গত বুধবার থেকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। কয়েকদিনের নিবিড় পরিচর্যার পরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি। তিনি স্বামী ও চার সন্তানকে রেখে গেছেন।
শেকড় ও শৈশব
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন, বেড়ে ওঠেন কুষ্টিয়ায়। ছোটবেলা থেকেই পরিবারে সাংস্কৃতিক পরিবেশের কারণে সংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ তৈরি হয়। তাঁর বাবা তাঁকে প্রথমে শাস্ত্রীয় সংগীতের পাঠ দেন। তবে জীবনের বাঁকবদল ঘটে কুষ্টিয়ায় দোল পূর্ণিমার এক অনুষ্ঠানে, যেখানে তাঁর দেখা হয় প্রখ্যাত লালনশিল্পী মকসেদ আলী শাইয়ের সঙ্গে। তিনিই তাঁকে লালনের দর্শন ও গানের জগতে প্রবেশ করান।
লালন গান ও খ্যাতির শীর্ষে যাত্রা
লালন সংগীতের দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে নতুন রূপ পায়। তাঁর কণ্ঠস্বর শুধু সুর নয়, ছিল দর্শনেরও বাহক। ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটি যেন হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের পথনির্দেশক।
তবে তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম স্বীকৃতি আসে দেশপ্রেমের গান দিয়ে। ১৯৭৩ সালে তিনি পরিবেশন করেন দেশাত্মবোধক গান ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’। এর মধ্য দিয়ে লাখো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। পরবর্তীতে ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ কিংবা ‘মিলন হবে কত দিনে’র মতো গান তাঁকে স্থায়ীভাবে লোকসংগীতের শীর্ষে পৌঁছে দেয়।
সংগীত সাধনা ও উত্তরাধিকার
শুধু গাইতেই নয়, লালন সংগীত সংরক্ষণ ও প্রচারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ফরিদা পারভীন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন’, যেখানে নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন—ধৈর্য, নিষ্ঠা ও দীর্ঘমেয়াদি সাধনা ছাড়া প্রকৃত শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়।
তিনি একবার সাক্ষাৎকারে বলেন, “দুঃখের বিষয় হলো, নতুন প্রজন্ম দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষায় আগ্রহী নয়; তারা শর্টকাট পথ খোঁজে। অথচ গুরুজনদের পথ অনুসরণ করলেই একজন গায়ক স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।”
সম্মাননা ও বিশ্ব স্বীকৃতি
ফরিদা পারভীনের অবদান দেশ–বিদেশে স্বীকৃত হয়েছে। ১৯৮৭ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা নারী কণ্ঠশিল্পীর সম্মাননা পান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি সমাদৃত হন; ২০০৮ সালে লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ফুকুওকা এশিয়ান কালচার প্রাইজ।
লালনের দর্শনে নিবেদিত জীবন
লালনের গান ও দর্শনকে তিনি জীবনের মন্ত্র হিসেবে ধারণ করেছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে তিনি লালনের শতাধিক গান সংরক্ষণের একটি প্রকল্পে কাজ করছিলেন। ভবিষ্যতে লালন দর্শন নিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও স্বপ্ন দেখতেন।
বিদায় ও উত্তরাধিকার
ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। তবে তাঁর কণ্ঠের সুর, গানের দর্শন ও জীবনদর্শন চিরকাল বেঁচে থাকবে শ্রোতাদের হৃদয়ে। লালনের গান যেমন যুগে যুগে মানুষকে সত্য ও মানবতার বার্তা দিয়েছে, তেমনি ফরিদা পারভীনের শিল্পীজীবনও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

