নেটো দেশগুলো রুশ তেল কেনা বন্ধ করলেই রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তবে এবার তিনি শর্তও জুড়ে দিয়েছেন—নেটো দেশগুলোকে অবশ্যই রুশ জ্বালানি কেনা বন্ধ করতে হবে এবং একইসঙ্গে চীনের পণ্যের ওপর ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে হবে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইউরোপের জ্বালানি নির্ভরতা, নেটোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব।

ট্রাম্পের বার্তা: “আমি প্রস্তুত”

নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, “আমি রাশিয়ার ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিতে প্রস্তুত, তবে তখনই যখন নেটো দেশগুলো একই পদক্ষেপ নিতে রাজি হবে এবং তা বাস্তবায়ন শুরু করবে।” তিনি অভিযোগ করেন, এখনো কিছু দেশ রুশ তেল কিনছে, যা “অবিশ্বাস্য ও লজ্জাজনক”। এর ফলে রাশিয়ার সঙ্গে দর কষাকষিতে নেটোর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

তিনি নেটো দেশগুলোর উদ্দেশে এক প্রকার খোলা চিঠি লিখে বলেন: “আমি প্রস্তুত, আপনারা যখন প্রস্তুত হবেন। শুধু বলুন, কবে থেকে শুরু করব?”

ইউরোপের রুশ জ্বালানি নির্ভরতা

রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আক্রমণের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাস আসত রাশিয়া থেকে। এখন সেই হার কমে প্রায় ১৩ শতাংশে নেমেছে। তবে ট্রাম্পের মতে, এটিও যথেষ্ট নয়।

ইউরোপীয় দেশগুলো ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২১০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের তেল ও গ্যাস রাশিয়া থেকে কিনেছে। গবেষণা সংস্থা Centre for Research on Energy and Clean Air বলছে, এই বিপুল অর্থ সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ তহবিলে গিয়েছে।

ইইউ ইতিমধ্যেই ২০২৮ সালের মধ্যে রুশ জ্বালানির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চাইছে সেটি আরও দ্রুত হোক—আংশিকভাবে তাদের নিজেদের জ্বালানি রপ্তানির বাজার বাড়ানোর জন্য।

চীনের প্রসঙ্গ টেনে আনা

ট্রাম্প শুধু রাশিয়াতেই থামেননি। তিনি দাবি করেছেন, নেটো দেশগুলোকে চীনের পণ্যের ওপর ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসাতে হবে। তার মতে, এতে চীনের “রাশিয়ার ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ” দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে তিনি শর্ত দিয়েছেন—যুদ্ধ শেষ হলে এই শুল্ক প্রত্যাহার করা যেতে পারে।

নেটোর ভেতরে জটিল সমীকরণ

ট্রাম্পের এই আহ্বান ইইউ নয়, নেটোকে উদ্দেশ্য করে। ফলে এতে অন্তর্ভুক্ত হলো তুরস্কের মতো দেশ, যারা রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল ক্রেতা এবং মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আঙ্কারাকে রাশিয়ার জ্বালানি ছাড়তে রাজি করানো নেটোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

পূর্ব ইউরোপে উত্তেজনা

ট্রাম্পের বার্তা আসে এমন সময়ে, যখন রাশিয়ার ১২টির বেশি ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে। ওয়ারশ বলছে এটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ, যদিও মস্কো দাবি করেছে তাদের পোল্যান্ড আক্রমণের কোনো পরিকল্পনা নেই। এ ঘটনায় ডেনমার্ক, ফ্রান্স এবং জার্মানি নতুন নেটো মিশনের অংশ হিসেবে পূর্ব সীমান্তে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে।

ইউক্রেনের আহ্বান

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও একই সুরে কথা বলেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমাদের অবশ্যই রাশিয়ার যেকোনো ধরনের জ্বালানি কেনা বন্ধ করতে হবে। রাশিয়ার সঙ্গে কোনো বাণিজ্যই চলতে দেওয়া যাবে না, যদি সত্যিই যুদ্ধ থামাতে চাই।”

ট্রাম্পের অবস্থান কি বাস্তবায়িত হবে?

আগেও ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর “দ্বিতীয় ধাপের শাস্তি” দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নেননি। এবারও তিনি নেটো দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করতে চাইছেন—প্রথমে তাদের পদক্ষেপ, তারপর তার নিষেধাজ্ঞা।

এখন প্রশ্ন হলো, ইউরোপ কি দ্রুত রাশিয়ার জ্বালানি ছেড়ে দেবে, নাকি নিজেদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে ধীর গতিতেই এগোবে? এবং নেটো কি তুরস্কের মতো সদস্য দেশকে রাজি করাতে পারবে? এর উত্তরই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের হুমকি আসলে বাস্তবায়িত হবে, নাকি আগের মতো কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

spot_img