নেপালে সংসদ পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো

সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিবৃতি, অন্তর্বর্তী সরকারে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

নেপাল আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে। সপ্তাহজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ, সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি এবং প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর দেশটি এখন নতুন অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। শনিবার আটটি বড় রাজনৈতিক দল একযোগে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলকে সংসদ পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছে।

কীভাবে শুরু হলো সংকট

সবকিছুর সূত্রপাত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। গত সপ্তাহে সরকার হঠাৎ করে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ ২৬টি প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেয়। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যাদের পরিচিতি “জেন জেড” আন্দোলনকারীরা, তারা এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে রাস্তায় নেমে আসে।

প্রথমে এটি ছিল ডিজিটাল স্বাধীনতার দাবি, কিন্তু দ্রুতই আন্দোলন রূপ নেয় দুর্নীতি ও রাজনৈতিক বংশপরম্পরার বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভে। সামাজিক মাধ্যমে আগে থেকেই চলছিল “নেপো কিড” ক্যাম্পেইন—যেখানে নেতাদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাপন ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হচ্ছিল।

সহিংসতা ও পদত্যাগ

সপ্তাহের মাঝামাঝি কাঠমান্ডুর রাস্তায় নেমে আসে হাজারো মানুষ। রাগান্বিত জনতা সংসদ ভবন ও সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে, শুরু হয় সংঘর্ষ। প্রাণ হারায় অন্তত ৫০ জন। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি মঙ্গলবার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি

ওলির পদত্যাগের পর প্রেসিডেন্ট পৌডেল শুক্রবার সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। ৭৩ বছর বয়সী কার্কি নেপালের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তার সম্পর্কে পরিচিতি—“পরিষ্কার ভাবমূর্তি, আপসহীন সততা।” শপথের পর তিনি প্রতিশ্রুতি দেন দ্রুত একটি অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা গঠন করবেন।

কার্কির নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে জেন জেড আন্দোলনের নেতারা। তাদের দাবি ছিল সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচন ঘোষণা করা, যা আংশিকভাবে পূরণ হয়েছে। সরকার আগামী বছরের ৫ মার্চ নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি

তবে সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল। নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল, মাওবাদী কেন্দ্রসহ আটটি দল শনিবার যৌথ বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপ সংবিধানবিরোধী এবং বিচার বিভাগের পূর্ববর্তী রায়ের সাথেও অসঙ্গতিপূর্ণ। তাদের বক্তব্য, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে দেওয়া যাবে না; বরং নির্বাচনের প্রস্তুতি সংসদ পুনর্বহাল করেই হওয়া উচিত।

প্রেসিডেন্টের বক্তব্য

প্রেসিডেন্ট পৌডেল পরে নিজের বিবৃতিতে বলেন, দেশ একটি “খুব কঠিন ও ভীতিকর পরিস্থিতির” মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ তৈরি হচ্ছে। তার ভাষায়, “সংবিধান বেঁচে আছে, সংসদীয় ব্যবস্থা বেঁচে আছে, ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এখনো বিদ্যমান। আগামী ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের সামনে আরও কার্যকর গণতন্ত্রের পথ খুলে যাবে।”

সামনে কী অপেক্ষা করছে

অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখন একাধিক চ্যালেঞ্জ—সংসদ ভবনসহ পুড়ে যাওয়া স্থাপনা পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, বিক্ষোভকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সহিংসতায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা। একই সঙ্গে রয়েছে আশঙ্কা—এই তরুণ গণআন্দোলন যদি শুধু নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তবে নতুন সরকারকেও তীব্র চাপের মুখে পড়তে হবে।

সামরিক বাহিনীর প্রত্যাহার

কার্কি শপথ নেওয়ার পর সেনারা রাস্তাঘাট থেকে ব্যারাকে ফিরে গেছে। ফলে রাজধানী কাঠমান্ডু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতা দেখিয়েছে—নেপালের গণতন্ত্র এখনো ভঙ্গুর, এবং জনগণ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক দুর্নীতি আর অকার্যকর শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ পোষণ করছে।

spot_img