রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ১১ দিন আগে মারা যাওয়া একজন ইসলামী সুফি সাধকের দরবার শরিফ ও বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর কবর থেকে তাঁর লাশ তুলে পুড়িয়ে দিয়েছে তৌহিদী জনতা।
তারা দরবারের খাদেম রাসেল মোল্লাকে (২৮) পিটিয়ে হত্যা করেছে। আহত অর্ধ শতাধিক। গতকাল শুক্রবার এই ঘটনা ঘটে।
নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’ নামে পরিচিত ঐ সাধক জীবীতকালে নিজেকে ‘ইমাম মাহাদি’ দাবি করেছিলেন বলে সালাফি ইসলামের অনুসারী তৌহিদী জনতা এবং তাদের পৃ্ষ্ঠপোষক রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলো ক্ষুব্ধ ছিল।
গত ২৩ আগস্ট বৃদ্ধ নুরাল পাগলার মৃত্যু হলে তারা অভিযোগ তোলেন, তাঁর মরদেহের দাফন শরিয়ত মোতাবেক হয়নি। কারণ, কবরটি সমতলের চেয়ে কিছুটা উচুতে স্থাপন করা হয়েছিল। তাই তাঁরা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলের নেতাদের নিয়ে ‘ঈমান-আকিদা রক্ষা কমিটি’ গঠন করে বিক্ষোভ-কর্মসূচীর ঘোষণা দেয়।
নুরাল পাগলার ছেলে মেহেদী নূর জিলানী ১ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে শরিয়ত না মানার মিথ্যা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। “ইসলামের বিধান মেনেই আব্বার শবদেহ দাফন করা হয়েছে। তবে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কিছুটা উঁচু করে দাফন করা হয়েছে। এটা ইসলাম বিরোধী কাজ নয়,” বলেন তিনি।
এ নিয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি ও নুরাল পাগলার পরিবারের সদস্যদের কয়েক দফায় বৈঠক হয়। সরকার ও আন্দোলনকারীদের চাপে মরহুম নুরাল পাগলার অনুসারীরা তার কবর নিচুও করেছিল। কিন্তু তাতে শান্ত হয়নি ইমান আকিদা রক্ষা কমিটি।
জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অ্যাড. নুরুল ইসলাম শুক্রবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, “দাবি অনুযায়ী কবর নিচু করা হয়েছে। মূল দাবি মেনে নেওয়ায় পরবর্তী ‘মার্চ ফর গোয়ালন্দ’সহ অন্যান্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। তবে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আজকের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে।”
সেই অনুযায়ী গতকাল শুক্রবার নামাজের পর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ফকির মহিউদ্দিন আনসার ক্লাবের মাঠে তাদের বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হলে সেখানে নেতারা উত্তেজক বক্তব্য দেন। ফলে সমবেত তৌহিদী জনতা কিছুক্ষণের মধ্যে জঙ্গি মবে রূপান্তরিত হয়। তারা নুরাল পাগলার দরবার শরিফ ও বাড়িতে হামলে পড়ে।
হামলা আগে বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গোয়ালন্দ উপজেলা ইমাম কমিটির সভাপতি মাওলান জালাল উদ্দিন, গোয়ালন্দ উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আইয়ুব আলী খান, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম মণ্ডল এবং বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ।
পরে বিক্ষুব্ধ জনতা দরবারের দিকে যেতে চাইলে প্রশাসন তাদের থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা আরও মারমুখী হয়ে ওঠেন। তারা গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সরকারি গাড়ি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসির গাড়ি ভাঙচুর করেন। ইউএনও নাহিদুর রহমান ভয়েসকে জানিয়েছেন, তৌহিদী জনতাকে সামলাতে গিয়ে ৫ জন পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনের ২ জন আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, মিছিল নিয়ে প্রথমে নুরুল হকের আস্তানার ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। তখন দরবারের লোকজন ইটপাটকেল ছুঁড়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলে অপর পাশ থেকেও ইটপাটকেল ছোড়া হয়। একপর্যায়ে কয়েকশ লোক দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে দরবারে হামলা চালায়। এ সময় নুরাল পাগলার ভক্তদের বেধড়ক পেটাতে থাকে।
দরবারের খাদেম ২৮ বছর বয়সী রাসেল মোল্লা দলবদ্ধ মুসল্লির নির্মম পিটুনিতে গুরুতর আহত হয়ে মুখ থুবরে পড়ে থাকেন। তাকে মুমুর্ষ অবস্থায় উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার হলে তাঁর মৃত্যু ঘটে।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শরিফ ইসলাম এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ার্ড মাস্টার আতিয়ার রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নিহত রাসেল মোল্লা গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব তেনাপচা ঝুটু মিস্ত্রি পাড়ার বাসিন্দা আজাদ মোল্লার ছেলে।
দরবার এবং নুরুল হকের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে তৌহিদী জনতা। পরে তারা নুরুল হকের লাশ কবর থেকে তুলে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ বাসস্ট্যান্ডের অদূরে পদ্মার মোড় এলাকায় নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। হামলায় ৫০ জনের অধিক লোক আহত হন। হামলা শেষে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস থেমে থেমে কাজ করছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক বছর আগে গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে নিজ বাড়িতে দরবার শরীফ গড়ে তোলেন নুরুল হক। গত ২৩ আগস্ট বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় মারা যান নুরুল হক। ওই দিন রাতে মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে বিশেষ কায়দায় দরবারে তার লাশ দাফন করা হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কবর সমতল করাসহ কয়েকটি দাবি জানায় স্থানীয় আলেম সমাজ।
এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) সংবাদ সম্মেলন করে নুরুল হকের দরবারে অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগ করে উপজেলা ঈমান-আকিদা রক্ষা কমিটি। তারা বৃহস্পতিবারের মধ্যে কবর সমতলসহ বিভিন্ন দাবি জানায়। অন্যথায় শুক্রবার জুমার নামাজের পর গোয়ালন্দ আনসার ক্লাব মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশ ও পরে ‘মার্চ ফর গোয়ালন্দ’ কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেয়।
এই কর্মসূচি ঘিরে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ আলেম-ওলামা ও দরবার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক সভা করে। শুক্রবার সকালে রাজবাড়ী জেলা জামায়াতের আমির অ্যাড. নুরুল ইসলাম ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা দরবার শরীফ পরিদর্শন করেন। এসময় তারা দরবার কর্তৃপক্ষ শর্ত পূরণ করেছে বলে জানান।
এদিকে শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গোয়ালন্দ প্রেসক্লাবে দরবারের ভক্তরা সংবাদ সম্মেলন করে জানান, আলেম-ওলামাদের দাবির প্রেক্ষিতে গোয়ালন্দ দরবার শরীফের পীর নুরাল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’র কবর উঁচু থেকে নিচু করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দরবারে ইসলামের সব নিয়মকানুন পালন করা হয় দাবি করে ভক্ত মেহেদি আল আমিন বলেন, আলেম ওলামাদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় ‘নুরাল পাগলা’র কবর উঁচু থেকে নিচু, কবরের দেয়ালের রঙ পরিবর্তন ও ইমাম মেহেদি দরবার শরিফ লেখা সাইনবোর্ড অপসারণ করা হয়েছে। এছাড়া এখানে মুসলমান ও সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাড়া এখানে কেউ আসে না।
উল্লেখ্য, গত ২৩ আগস্ট ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুরুল হক ‘নুরাল পাগলা’র মৃত্যু হয়। এরপর তার প্রতিষ্ঠিত গোয়ালন্দ দরবার শরীফের ভেতরে মাটি থেকে কিছুটা উঁচু বেদিতে তাকে দাফন করা হয়। এরপর থেকে কবর নিচু, রঙ পরিবর্তন ও ইমাম মেহেদি দরবার শরিফ লেখা সাইনবোর্ড অপসারণের দাবি তোলেন ঈমান-আকিদা রক্ষা কমিটি।
এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাহিদুর রহমান জানান, আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বাড়ি ও দরবারে হামলা করে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এসময় ইউএনওর সরকারি গাড়ি ও পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। আহতের সংখ্যা এখন বলা যাচ্ছে না।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটবে তা ধারণা করা যায়নি। হামলায় রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ আল রাজিব আহত হন। এছাড়াও ৫ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে রাজবাড়ীর এসপির নেতৃত্বে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও র্যাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কাজ করছিল।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. শরিফুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে ২২ জন আহত রোগী এসেছেন। তারমধ্যে তিনজনকে ভর্তি করা হয়েছে এবং ১৯ জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

