ডেঙ্গু: এক সপ্তাহে মৃত্যু ১২, হাসপাতাল ভর্তি আড়াই হাজার

বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বার্তা: “সেপ্টেম্বরে অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে”

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে ডেঙ্গুতে ১২ জন মারা গেছেন। একই সময়ে নতুন করে ২ হাজার ৫৫৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

এ নিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৩ হাজার ৪৬৭ জন। এর মধ্যে ৩১ হাজার ৭৯৪ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে মারা গেছেন ১৩০ জন।

শুধু ঢাকায় নয়, গ্রাম এবং জেলা-অঞ্চলেও বিষাক্ত শ্বাস ফেলছে ডেঙ্গু। পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটবিজ্ঞানী কবিরুল বসার বলে গেছেন, “পরিস্থিতি সংকটপূর্ণ। ভাইরাস ইতোমধ্যেই পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে।”

তিনি বলেছেন, আগস্টে জুলাইয়ের তিনগুণ বেশি রোগী এসেছে। সেপ্টেম্বরে শিখরে পৌঁছাতে পারে।

আরেক জন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেছেন, “ক্লিনিক থেকে জেলা হাসপাতাল—সবার অবকাঠামো শক্ত করতে হবে। সাশ্রয়ী পরীক্ষা এবং সঠিক রোগনির্ণয় কেন্দ্র বাড়াতে হবে।”

দিনভিত্তিক পরিসংখ্যান

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টের শেষ ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন শত শত।

  • ৩০ আগস্ট: ভর্তি ৩৬৭ জন, মৃত্যু নেই
  • ৩১ আগস্ট: ভর্তি ৫৬৮ জন, মৃত্যু ৪
  • ১ সেপ্টেম্বর: ভর্তি ৫৫২ জন, মৃত্যু নেই
  • ২ সেপ্টেম্বর: ভর্তি ৪৭৩ জন, মৃত্যু ৩
  • ৩ সেপ্টেম্বর: ভর্তি ৪৪৫ জন, মৃত্যু ২
  • ৪ সেপ্টেম্বর: ভর্তি ৩৬৩ জন, মৃত্যু ৩
  • ৫ সেপ্টেম্বর: ভর্তি ১৫৮ জন, মৃত্যু নেই

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, “ভাইরাস এখন গ্রামাঞ্চলসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যদি আগ্রাসী পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা জোরদার করতে হবে। জ্বর হলে মানুষকে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে।”

কেন ডেঙ্গু বাড়ছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ড্রেন ও নালা পরিষ্কারের ঘাটতি, এবং বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানিই এডিস মশার বংশবৃদ্ধির প্রধান কারণ। বর্ষাকালে এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

করণীয়

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় সবচেয়ে জরুরি হলো মানুষের অংশগ্রহণ। প্রতিটি পরিবারকে বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলতে হবে। মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি ও রিপেলেন্ট ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে নিয়মিত ফগিং ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।

অতীতের অভিজ্ঞতা

২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিল ৫৭৫ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক লাখের বেশি মানুষ। আর ২০২৩ সালে রেকর্ড সংখ্যক ১,৭০৫ জন মারা গিয়েছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু বছর হিসেবে বিবেচিত। ফলে চলতি বছরের পরিস্থিতিও বিশেষজ্ঞদের কাছে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং প্রতি বছরই তা ভয়াবহ আকারে ফিরে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতি ছাড়া এই মহামারির মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।

spot_img