নাফ নদে শত শত রোহিঙ্গা হত্যা: এক বেঁচে যাওয়ার চোখে ২০২৪ এর গণহত্যা

৫ আগস্ট ড্রোন ও আর্টিলারি হামলায় শত শত প্রাণহানি—জাতিসংঘ সতর্ক করছে ২০১৭ সালের ভয়াবহতার পুনরাবৃত্তি

টেকনাফ, বাংলাদেশ (দ্য ভয়েস) — নুর আলম এখনো কেঁপে ওঠেন সেদিনের স্মৃতিতে। ৩১ বছর বয়সী এই রোহিঙ্গা যুবক স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে মংডু শহরের গ্রাম ছেড়ে নাফ নদ পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে চাইছিলেন। ছোট কাঠের নৌকাটি যখন মাঝনদীতে পৌঁছাল, তখন আকাশে দেখা দিল এক ড্রোন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিস্ফোরণে আকাশ ভরে গেল ধোঁয়া ও আগুনে।

“আমি হাত দিয়ে সন্তানদের ঢাকতে চেয়েছিলাম,” তিনি ধীরে ধীরে বললেন। “কিন্তু মুহূর্তেই সব অদৃশ্য হয়ে গেল ধোঁয়া আর আগুনে।” সেই বিস্ফোরণে নিহত হন তার স্ত্রী ও ছোট ছেলে। নদীতে ভাসতে থাকে অসংখ্য লাশ। “চোখ যেদিকে ঘোরাই, শুধু মৃতদেহ ভাসছে।”

নুর আলমের গল্প একা নয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নাফ নদ তীরে জড়ো হওয়া ১০–১২ হাজার রোহিঙ্গার ওপর ড্রোন ও আর্টিলারি হামলা চালানো হয়েছিল। হামলায় শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটে। তারা সবাই পালাচ্ছিলেন রাখাইনে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত থেকে বাঁচতে।

নদীর তীরে আতঙ্কের মুহূর্ত

প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন চারপাশের ভয়ঙ্কর দৃশ্য। “হাজার হাজার মানুষ নদীর তীরে ছিল… তারপরই ড্রোন আসে,” বললেন এক বেঁচে যাওয়া। “সবদিকে লাশ, চারপাশে শুধু কান্না।” আরেকজন জানান, তার নৌকায় ৫০ জন ছিলেন। হামলার পর মারা যান ৩৮ জন, যার মধ্যে চারজন শিশু।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে সংঘাত শুরুর পর থেকে রাখাইনে অন্তত ১,৬০০ সহিংস ঘটনার নথি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪০৯টি বিমান হামলা ও ২৭৪টি আর্টিলারি আক্রমণ। এ সময় অন্তত ৩৭৪ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

আরাকান আর্মি বিতর্কে

সাম্প্রতিক হামলার পেছনে বিশেষভাবে অভিযুক্ত হয়েছে আরাকান আর্মি (এএ)। এক সময় রাখাইন জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করা এই গোষ্ঠী এখন রাখাইনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দাবি, হামলাকারী ড্রোনগুলো এসেছিল আরাকান আর্মি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে। যদিও তারা দায় অস্বীকার করেছে এবং দোষ চাপিয়েছে “চরমপন্থি মুসলিম গোষ্ঠীর” ওপর।

বিশ্লেষকরা বলছেন, “যারা একসময় বিদ্রোহী ছিল, এখন তারাই ক্ষমতায়। আর ক্ষমতার সঙ্গে আসছে ভয়াবহ দায়।”

মানবিক বিপর্যয়

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভল্কার তুর্ক বলেছেন, “রোহিঙ্গা এবং রাখাইন উভয় জাতিগোষ্ঠীই এই সংঘাতের মূল শিকার। নির্বিচারে হামলা, বাস্তুচ্যুতি, অগ্নিসংযোগ এবং গুমের ঘটনা থামছে না।” তিনি মিয়ানমার পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর আহ্বান জানান।

নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। কক্সবাজার ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলো ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়ার মতো চাপের মুখে। খাবারের রেশন কমে গেছে, আন্তর্জাতিক সাহায্যও হ্রাস পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) কার্যত বিপর্যয়ের মুখে।

শিবিরগুলোতে এখন প্রতিদিনই শোনা যায় না খাওয়া শিশুদের কান্না, খাবারের জন্য পরিবারগুলোর তর্ক-বিতর্ক, এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বাড়তে থাকা টানাপোড়েন।

২০১৭ সালের প্রতিধ্বনি

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ২০২৪ সালের এই হত্যাযজ্ঞ ২০১৭ সালের জাতিগত নির্মূল অভিযানের পুনরাবৃত্তি। পশ্চিমা দেশগুলো নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের চিন্তা করছে, তবে নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতা কার্যকর পদক্ষেপে বাঁধা দিচ্ছে।

আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে অস্থির করে তুলতে পারে।

“নদীই হলো কবর”

নুর আলম এখন টেকনাফের এক অস্থায়ী আশ্রয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে বেঁচে আছেন। প্রায়ই নীরব থাকেন, তবে মাঝে মাঝে স্মৃতি ফিরে আসে।

“আমরা ভেবেছিলাম নদী আমাদের বাঁচাবে,” তিনি বললেন। “কিন্তু সেটাই হয়ে গেল আমাদের কবর।”

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles