কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিন দিনের আন্তর্জাতিক ‘স্টেকহোল্ডার্স’ ডায়ালগ শেষ হয়েছে বুধবার (২৭ আগস্ট)। অংশগ্রহণকারীদের কথায় —স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একমত শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ে দ্রুত কার্যকর করার মতো কোনো প্রতিশ্রুতি বা প্রয়োগ-ব্যবস্থা সামনে আসেনি।
জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতিনিধিরা বলেন, নিউ ইয়র্কে ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে যে ‘হাই-লেভেল কনফারেন্স’ হবে, এই সংলাপ তার প্রস্তুতি; তহবিল ও রাজনৈতিক চাপ দু’দিকেই গতি আনার চেষ্টা চলছে।
সংলাপে ইউএনএইচসিআর-এর রাওফ মাজুও, ইউএন আবাসিক সমন্বয়ক রানা ফ্লাওয়ার্স, IIMM-এর কৌমজিয়ানসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা ছিলেন; দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
কিন্তু আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে যাদের প্রভাব বেশি—বেইজিং-নয়াদিল্লি-মস্কো-ওয়াশিংটন—তাদের দৃশ্যমান নীতি-অঙ্গীকারের সংকেত খুব একটা মেলেনি।
ইউনূসের সাত দফা: নীতিগত শক্ত বার্তা, কিন্তু নতুন কী?
দ্বিতীয় দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাত দফা প্রস্তাব দেন—দ্রুত ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ, দাতাদের অব্যাহত সহায়তা, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির কাছে নিরাপত্তা-জীবিকা নিশ্চয়তা, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ ও অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আসিয়ানের সক্রিয়তা, গণহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও আন্তর্জাতিক আদালতে জবাবদিহি ত্বরান্বিত করা। তিনি বলেন, “কথার অলঙ্কার নয়, এখন দরকার অ্যাকশন।”
কিন্তু সংলাপে উপস্থিত নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের একাংশের প্রশ্ন—এই পয়েন্টগুলোর কোনোটিই অজানা নয়; বহু বছর ধরে বাংলাদেশ, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এগুলোই তো বলছে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো—কে, কীভাবে, কবে থেকে বাস্তবায়ন করবে।
ঈদের আগে স্বপ্ন ভঙ্গ
গত মার্চে রমজানে কক্সবাজার সফরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাহায্য জোগান বাড়ানোর তাগিদ দেন; একই সময়ে রেশন কাটার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন।
কয়েক সপ্তাহ পর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ঘোষণা করে—তহবিল না পেলে ই-ভাউচার অর্ধেকে নামবে, মাসিক বরাদ্দ ১২.৫০ ডলার থেকে ৬ ডলারে নামানোর পরিকল্পনা চলছে। এপ্রিল থেকে সেই কাটছাঁট কার্যকর হওয়ার বার্তায় শিবিরে খাদ্য-নিরাপত্তা, অপুষ্টি ও শিক্ষাব্যবস্থায় ধস নেমেছে।
তহবিল সংকটে ৪,৫০০-এর বেশি লার্নিং সেন্টার বন্ধ হওয়ায় লক্ষাধিক শিশুর পড়াশোনা থমকে গেছে; শিশুবিবাহ ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম বেড়েছে—হিউম্যানিটেরিয়ান সংস্থাগুলোর সতর্কতা। চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও স্যানিটেশনে কাটছাঁট শিবিরজীবনকে আরও অনিশ্চিত করছে।
১.৮ লাখ নাম ‘ভেরিফাই’—তবু প্রত্যাবাসন শূন্য
এপ্রিলে ব্যাংককে বৈঠকের পর বাংলাদেশ জানায়—মিয়ানমার ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার জন্য ‘যোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু চার মাস পরেও একজনকেও ফেরত নেওয়ার খবর নেই। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের দুই দফা উদ্যোগ শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব-নিশ্চয়তা না থাকায় ব্যর্থ হয়েছিল; ২০২৩ সালের ‘পাইলট’ চেষ্টাও একই কারণে এগোয়নি।
শরণার্থী নেতারা বলছেন—“ভেরিফিকেশন মানে নাগরিকত্ব নয়; আমরা পূর্ণ নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা চাই, তাহলেই ফিরব।”
রাখাইনে যুদ্ধ: ‘সেফ জোন’ দাবির পেছনে যুক্তি
রাখাইনে আরাকান আর্মি এখন ১৭টির মধ্যে প্রায় ১৪টি টাউনশিপে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ; সিটুয়ে ও কিয়াকফিউসহ ক’টি জেলাশহরে এখনও জান্তা বা মিশ্র নিয়ন্ত্রণ।
এমন প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষায় ‘সেফ জোন’ তৈরি নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে—তবে বাস্তবায়ন ঘোরতর রাজনৈতিক-সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে।
জাতিসংঘের তদন্ত সংস্থা (IIMM) প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান সংলাপের আগে স্পষ্ট করে বলেছেন—রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অপরাধ বন্ধ না হলে এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে টেকসই প্রত্যাবর্তন ‘অসম্ভব’।
আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়া কোথায় দাঁড়িয়ে
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় (গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার) আইসিজে ২০২০ সালে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা দিয়েছে; ২০২৪-২৫ সালে একাধিক রাষ্ট্র ‘ইন্টারভেনশন’ করেছে; বছরের শেষে মৌখিক শুনানি নির্ধারিত হতে পারে।
অন্যদিকে আইসিসি ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ/মিয়ানমার পরিস্থিতিতে তদন্ত চালাচ্ছে। তবে জাতিসংঘের তদন্ত-মেকানিজমের (IIMM) কাজও তহবিল সংকটে টালমাটাল—যা জবাবদিহির গতিকে প্রভাবিত করছে।
বাস্তবতা কি বলছে?
কক্সবাজারের সংলাপ দেখাল—নীতির ভাষ্য জোরাল, কিন্তু প্রয়োগের শক্তি ছাড়া অচল। রাখাইনের যুদ্ধ, তহবিল-সংকট, আইনি-জবাবদিহির ধীরগতি—সব মিলিয়ে প্রত্যাবাসনের পথ এখনো বন্ধুর। ২৫ আগস্ট ‘জেনোসাইড রিমেমব্রেন্স ডে’-তে শরণার্থীদের দাবি—“আমাদের ঘরে ফেরান, অধিকার ফিরিয়ে দিন”— বিশ্বকে কতটুকু নাড়া দিতে পেরেছে প্রশ্ন রয়ে যায়।

