বিরোধাত্মক অবস্থানে  অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনী

জাতীয় পার্টি অফিস রক্ষায় নুরুল হক নূর ও তার সমর্থকদের লাঠিপেটা করায় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষেপেছে সরকার। বলছে, “জনবিরোধী ষড়যন্ত্র”, “অশুভ শক্তি,” “রেহাই পাবে না”

গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরকে সেনা সদস্যরা পেটানোর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে।

নুরের ওপর “হামলা”র তীব্র নিন্দা জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।

গতকাল রাতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) পরিস্থিতির কারণে বল প্রয়োগের কথা স্বীকার করেছিল।

সেনাবাহিনী বলেছিল, তারা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে আজ এক পাল্টা বিবৃতিতে অন্তর্বর্তী সরকার সেনাবাহিনীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিল।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে অন্তর্বর্তী সরকার তার সশস্ত্র বাহিনীকে ডিফেন্ড করার বদলে নূরের উপর “নৃশংস হামলা” হয়েছে অভিযোগ করেছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় এরজন্য দায়ী কর্মকর্তারা “রেহাই পাবে না”।

“অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশের জনগণকে আশ্বস্ত করছে যে, এই নৃশংস ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে সম্পন্ন করা হবে। প্রভাব বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, জড়িত কোনো ব্যক্তি জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবে না। স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সাথে এর বিচার সম্পন্ন করা হবে।”

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পাঠানো এই বিবৃতিতে বিদ্যমান সময়কে “সংকটকাল” এবং গতকাল জাতীয় পার্টির উপর মব সন্ত্রাস প্রতিরোধে সেনা সদস্যদের অবস্থানকে “জনবিরোধী ষড়যন্ত্র” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, “এই সংকটকালীন সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় আহ্বান জানায়।”

“আমাদের সংগ্রামের অর্জন রক্ষা করতে, জনবিরোধী সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে এবং গণতন্ত্রে আমাদের সফল উত্তরণ নিশ্চিত করতে সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া অপরিহার্য।”

সরকারের বিবৃতিতে এ ঘটনাকে নির্বাচন বানচালের “ষড়যন্ত্র,” সেনাবাহিনী সম্পর্কে “অশুভ শক্তি,” “গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত” করার মতো মারাত্মক ইঙ্গিতবহ শব্দরাশি ব্যবহার করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, “নির্বাচন বিলম্বিত বা বানচাল করার জন্য সকল ‘ষড়যন্ত্র’, বাধা অথবা প্রচেষ্টা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আমাদের গণতন্ত্রপ্রেমী দেশপ্রেমিক জনগণ দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করবে। জনগণের ইচ্ছা জয়ী হবে, কোনো ‘অশুভ শক্তি’কে গণতন্ত্রের পথে আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে দেওয়া হবে না।”

গতকাল শুক্রবার গণ অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা ঢাকার কাকরাইলে অবস্থিত জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা চালালে সংঘর্ষ বাধে। হামলা ও সংঘর্ষ ঠেকাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা লাঠিচার্য করলে দলটির প্রধান নুরুল হক নূরসহ অনেকে আহত হন।

হামলার আগে সেখানে দলীয় সমাবেশে নুরুল হক নূরকে মব সন্ত্রাসের পক্ষে মারাত্মক উস্কানিমূলক উগ্র বক্তব্য দিতে দেখা যায়। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, সারাদেশে মব তৈরি করে হামলা করতে পারলেও জাতীয় পার্টি অফিস ও দলটির নেতা জি এম কাদেরের উপর হামলা করতে না পারার জন্য তাকে আক্ষেপ করতে দেখা যায়।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গতরাতে আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করছে এবং জনমনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা আনয়নে সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে সদা প্রস্তুত রয়েছে। জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী সর্বদা বদ্ধপরিকর।”

আইএসপিআর বলেছিল, “আজ (শুক্রবার) রাত আনুমানিক ৮টায় রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় বেশ কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেড়ে গেলে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা কামনা করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয় এবং এতে কয়েকজন সদস্য আহত হন।”

”ঘটনার শুরুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগ করার জন্য ও দেশের বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ জানায়। তবে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কতিপয় নেতাকর্মী তা উপেক্ষা করে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে। তারা সংগঠিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় এবং আনুমানিক রাত ৯টার দিকে মশাল মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি করে। এসময় তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়ারও চেষ্টা চালায়।”

“এছাড়াও বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সাধারণ জনগণের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব চেষ্টা তারা অগ্রাহ্য করে। ফলস্বরূপ জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, আজকের উদ্ভূত ঘটনায় সেনাবাহিনীর ৫ জন সদস্য আহত হয়।”

ঘটনার পর গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে অনেকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে উত্তেজক বক্তব্য প্রদান করে। এমনকি ক্যান্টনমেন্টে হামলা করার হুমকি দেওয়া হয়। সেনা প্রধানকে বরখাস্ত করার দাবি জানানো হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীকে অতিসত্তর ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার দাবি জানানো হয়। শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতে নেতৃত্ব দেওয়া এই সংগঠনটির ভ্যারিফাইড ফেসবুক পেজে লেখা হয়েছে,

“ব্যারাকে যাও তাড়াতাড়ি,
নো মোর মিলিটারি।”

তবে সেখানে হাজার হাজার মন্তব্যকারী সমালোচনা করেছেন, এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা বর্তমানে সেনাবাহিনীর পাহারায় থেকেই সাধারণ মানুষের উপর ক্ষমতা দেখাচ্ছে এবং দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাস চালাচ্ছে। সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে গেলে তারা নিজেরাই অসহায় হয়ে পড়বে।

বিশেষ করে ইউনুস সরকার সমর্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টি –এনসিপি’ গত ২১ জুলাই “মার্চ টু গোপালগঞ্জ” অভিযানে গিয়ে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে চড়ে পালিয়ে আসা এবং তাদের পক্ষে সেনাবাহিনীর শক্তি প্রয়োগ ও পাঁচজন সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সেনাবাহিনী এদেরকে পাহারা দিলে ভালো বলে, কিন্তু মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিলেই তারা সেনাবাহিনীকে খারাপ বলছে।

গত বছরের ৫ আগস্ট ইসলামপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী অসংখ্য পুলিশ হত্যাসহ নৈরাজ্যকর আন্দোলনের মাধ্যমে পরিস্থিতি তৈরি করে সেনাবাহিনীর সহায়তায় অভ্যুত্থান ঘটিয়ে  মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনী মাঠে রয়েছে।

এই সময়ে দেশজুড়ে মব সন্ত্রাস চালিয়ে বিগত সরকারের সমর্থক শত শত মানুষকে হত্যা ও হাজার হাজার বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যম কার্যালয়গুলো দখল করে এবং আড়াই শতাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যামামলা দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

পুলিথ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিমাসে গড়ে অন্তত ৪৩ জন মানুষের মরদেহ বিভিন্ন নদনদীতে পাওয়ার খবর প্রকাশ পাওয়ায় মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

spot_img