মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে অপমান ও মব সৃষ্টির প্রতিবাদ

ছবিতে জুতা নিক্ষেপ ও বাসার সামনে মব জড়ো করার প্রতিবাদ জানিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি। ফজলুর রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার দাবি

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে অপমান, ছবিতে জুতা নিক্ষেপ ও বাসার সামনে মব তৈরি করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংগঠন ও শ্রেণী-পেশার মানুষ। প্রবীণ এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বিবেকবান সমাজ।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি পৃথক বিবৃতিতে রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের একজন প্রবীণ সৈনিক এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমান প্রায়শই টেলিভিশন টক শোতে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের পক্ষে কথা বলেন। ফলে তিনি স্বাধীনতা বিরোধী ও ইসলামী মৌলবাদীদের রক্তচক্ষুর শিকার হয়েছেন বলে সংগঠনগুলো মনে করছে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের ছবিতে জুতা নিক্ষেপ, মব সৃষ্টি ও অপমানের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা-প্রতিবাদ ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ।’ একই সঙ্গে ফজলুর রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিতেরও দাবি জানানো হয়।

সোমবার (২৫ আগস্ট) সংগঠনটির আহ্বায়ক রোকেয়া প্রাচী ও সদস্য সচিব এফ এম শাহীন সাক্ষরিত বিবৃতিতে বিবৃতিতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ সমস্ত স্মারক নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রতিবাদ করে যাওয়ার কারণেই বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে একটি গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপমান করছে এবং তাঁকে অপমান করে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

“এই ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির প্রতি অবমাননা নয়, বরং পুরো মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা সমাজ ও আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রতি চরম অবজ্ঞার শামিল। এর আগেও মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হয়েছে।”

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদের বিবৃতিতে সংহতি প্রকাশকারী দেশে-বিদেশে অবস্থিত অর্ধশতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। তারা হলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী ও চিত্রকর তাজুল ইমাম, সুইডেনের একটি জেলা আদালতের জুরি জজ বীর মুক্তিযোদ্ধা আক্তার জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের এলিজাবেথ সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. শ্যামল কুমার দাশ, নরওয়ের হউকেল্যান্ড ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের উপদেষ্টা মোঃ সাদিক হাসান, নরওয়ের বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইশতিয়াক জামিল, নরওয়ের হউকেল্যান্ড ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের গবেষক আমিনুর রহমান, কবি ও কথা সাহিত্যিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, সেক্যুলার বাংলাদেশ মুভমেন্ট ইউকের সভাপতি পুষ্পিতা গুপ্ত, আইসিএসফের ট্রাস্টি ড. রায়হান রশিদ, সুইডেনের অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শেলিনা আফরোজ জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক ড. এস. এম. মাসুম বিল্লাহ, কবি ও চিকিৎসক মিল্টন হাসনাত, অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র পরিচালক অরুণা বিশ্বাস, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গীর, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারি এবং সঙ্গীত শিল্পী মনিকা রউনক বাবলী।

বিশিষ্টজনরা বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই—যাঁদের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে, তাঁদের মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। মুক্তিযোদ্ধার প্রতি অপমান কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না।”

”আমরা এই অপমানজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।”

বিবৃতিতে আরও স্বাক্ষর করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ওমর সেলিম শের; গবেষক ড. আব্দুল আউয়াল; সাদিকা ইয়াসমিন রচনা, সঞ্চালক, প্রোগ্রাম প্রযোজক ও অ্যাক্টিভিস্ট; তূর্য কাজী; ফ্রিল্যান্স শিল্পী অর্জুন মান্না; জাসমিন চৌধুরী, সোশ্যাল জাস্টিস ক্যাম্পেইনার; রানা মেহের, সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; তমাল মাহবুব, অভিনেতা ও পরিচালক; আদিবা জাহান, সমাজকর্মী; প্রিয়াঙ্কা এলফফ্রস্ট, সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ার; কানাডা প্রবাসি মুস্তফা কায়েস ইমন; লেখক আহমেদ মনসুর; কবি ও নাট্যকার সায়েম উদ্দিন; গল্পকার শানেজুল ইসলাম; ফটোসাংবাদিক আমিনুল ইসলাম; লেখক নাসির উদ্দীন হায়দার; হাসান নাসির; কবি কানিজ ফাতেমা চৌধুরী; ফটোসাংবাদিক জুয়েল শীল; জাকিরুল হক টিটন, সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা; মোঃ মনিরুজ্জামান, সংগঠক ও চিত্রশিল্পী; বাণী ইয়াসমিন, সম্পাদক, বিবার্তা; খন্দকার ইসমাইল, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব; খোর্শেদুল আলম খসরু, চলচ্চিত্র প্রযোজক; অনামিকা প্রিয়ভাসিনি, মানবাধিকার কর্মী; মুশফিক গুলজার, চলচ্চিত্র নির্মাতা; শাহ আলম কিরণ, চলচ্চিত্র নির্মাতা; ড. মাসুদ পথিক, কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা; সায়মন সাদিক, চিত্রনায়ক; তৌফিক মারুফ, সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক; আল আমীন বাবু, সংগঠক ও সঙ্গীত শিল্পী; নাহার মমতাজ, সভাপতি, সর্ব ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু ফাউণ্ডেশন, সুইডেন; ভায়োলেট হালদার, সম্পাদক ও প্রকাশক, সময়ের শব্দ; মুরাদ খান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, র্যা পিড সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড, নেদারল্যান্ডস; শায়লা আহমেদ লোপা, সমাজকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মী; ফেরদৌসী হাসান, সমাজকর্মী; দীপান্বিতা রায় মার্টিন, সঞ্চালক ও গণমাধ্যমকর্মী; তুহিন দাস, কবি, আমেরিকা; সাইফ সামস, ইঞ্জিনিয়ার, নরওয়ে; মাহবুবুল হক, গণমাধ্যমকর্মী; অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য, নাট্যকর্মী; কুতুব হিলালী, কবি ও সাহিত্যকর্মী সম্পাদক, বাংলালিপি; এলবার্ট খান, নির্মাতা ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট; জামশেদ শামীম, অভিনেতা; জুটন চন্দ্র দাস, নির্মাতা; কবি কামরুল হাসান বাদল; ছড়াকার এমরান চৌধুরী; কবি ও সাংবাদিক শুকলাল দাশ; লেখক নীলিমা শামীম; লোকসাহিত্য গবেষক সামশুল আরেফিন; কবি শহীদুল আলীম; রহমান রনি; প্রাবন্ধিক শোয়েব নাঈম; লেখক ও সাংবাদিক রাজীব শীল; সাংবাদিক ঋতিক নয়ন; সংগঠক যিকরু হাবিব ওয়াহেদ; রাহুল দাশ নয়ন এবং অভিনেতা গাজী গোফরান।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র

অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের বাসার সামনে মব তৈরি করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আজ সোমবার এক বিবৃতিতে এ নিন্দা প্রকাশ করে সংস্থাটি।

আসকের বিবৃতিতে বলা হয়, মব তৈরি করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং তা পুরো সমাজকে আতঙ্কিত ও অবরুদ্ধ করার সমতুল্য। এ ধরনের বেআইনি তৎপরতা সুস্পষ্টভাবে সংবিধানে প্রদত্ত নাগরিকের মতপ্রকাশ, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকারের ওপর স্পষ্ট হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশ সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে জীবন ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা (অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২) এবং চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৯) দিয়েছে। মো. ফজলুর রহমানের বাসার সামনে সংঘটিত মবের ঘটনা এসব মৌলিক অধিকারকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। এ ঘটনা শুধু একজন প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান নয়, বরং সমগ্র সমাজের ওপর ভীতি সঞ্চার ও ভিন্নমত দমন করার ন্যক্কারজনক চেষ্টা।

আসক মনে করে, রাষ্ট্র যদি নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা শুধু সংবিধান লঙ্ঘন নয়, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারসমূহ এড়িয়ে যাওয়ার শামিল। বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করা। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা শুধু সংবিধানের পরিপন্থী নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি আঘাত। অবিলম্বে এ ধরনের মব রাজনীতি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সোমবার(২৫ আগস্ট) দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন,  ”এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, মবকারীরা সরকারের আশ্রয়েই লালিত হচ্ছে। তারা আরও বলেন, সরকার মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে আগ্রহী।”

জাসদ সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে মব ও ভিন্নমত দমন প্রতিরোধে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) এক বিবৃতিতে বলেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তির আস্ফালন ও তার সেগুনবাগিচাস্থ বাড়ির সামনে অবরোধ বিক্ষোভ ও মব সন্ত্রাস সৃষ্টির অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

দলটির পলিটবুরো নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এ দেশের একজন সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ধারার মানুষ, গত এক বছরে দেশ শাসনে বর্তমান সরকার ও তার সহযোগীদের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি টকশোতে তার মতামত প্রকাশ করে আসছেন। তার কথা কারও পছন্দ না হলে তিনিও গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করতে পারেন, কিন্তু হত্যার হুমকি দিয়ে, বাড়িঘর ঘেরাও করে কতিপয় ভূঁইফোড় সংগঠন যেভাবে ব্যক্তি ফজলুর রহমানের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করছেন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

বিবৃতিতে ফজলুর রহমানের জীবনের নিরাপত্তাসহ তার গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিতের দাবি জানানো হয় এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা রক্ষায় সব মুক্তিযুদ্ধের শক্তির ঐক্যবদ্ধতা কামনা করা হয়।

spot_img