রক্তাক্ত ২১ আগস্ট: বঙ্গবন্ধু এভিনিউ গ্রেনেড হামলার ২১ বছর

আজ রক্তাক্ত বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২১ আগস্ট একটি নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞের ভয়াল দিন। এদিন নারকীয় সন্ত্রাসী হামলার ২১তম বার্ষিকী। এতবছর পরও বিচারের নতুন নতুন প্রহসনের প্রেক্ষিতে বিচার প্রত্যাশাতেই দিন গুণতে হচ্চে নিহত, আহত ও স্বজনদের।

সুপ্রিম কোর্ট আজ বলেছে, আগামী ৪ সেপ্টেম্বর এই মামলার আপিলের রায় দেওয়া হবে। গত বছরের আগস্টে ষড়যন্ত্র ও রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়ে ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা ঘাতকরা সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও করে বিচারকদের পরিবর্তন করতে সফল হয়েছে। এরপর হাইকোর্টের দেখা গেল ২১ আগস্ট গণহত্যার কোনো দায়ী ব্যক্তি নেই। রায়ে সবাই খালাস।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী শান্তিপূর্ণ সমাবেশে এই নজির বিহীন গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে হিংসার দানবীয় সন্ত্রাস আক্রান্ত করে মানবতা। আক্রান্ত হন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় আয়োজিত সমাবেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এসে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ওই ঘটনায় দলীয় নেতাকর্মীরা মানববর্ম রচনা করে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করলেও গ্রেনেডের আঘাতে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ মোট ২৪ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান।

পরবর্তী সময়ে গ্রেনেড হামলার বিচারের রায়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি জোট সরকারের মন্ত্রী ও সরকারের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলে যে ওই সরকারের প্রত্যক্ষ মদতেই হামলাটি পরিচালিত হয়েছিল।

আজ ইতিহাসের এই জঘন্যতম গ্রেনেড হামলার ১৮তম বার্ষিকীতে বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাবনতচিত্তে হামলায় নিহতদের স্মরণ করবে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনটি পালনে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

কী ঘটেছিল ২০০৪–এর ২১ আগস্ট

তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। সেদিন ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতি বিরোধী’ শান্তি সমাবেশের আয়োজন করেছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ।

আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি ছিলেন। সন্ত্রাস বিরোধী শান্তি সমাবেশের আগে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে স্থাপিত অস্থায়ী ট্রাকমঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরপরই তাকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলা শুরু হয়। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে একের পর এক গ্রেনেড।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহুর্মুহু ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণের বীভৎসতায় মুহূর্তেই মানুষের রক্ত-মাংসের স্তুপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে। স্পিন্টারের আঘাতে মানুষের হাত-পাসহ বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। সভামঞ্চ ট্রাকের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় রক্তাক্ত নিথর দেহ।

লাশ আর রক্তে ভেসে যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সামনের পিচঢালা পথ। নিহত-আহতদের জুতা-স্যান্ডেল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ভেসে আসে শত শত মানুষের গগন বিদারী আর্তচিৎকার। বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টারত মুমূর্ষুদের কাতর-আর্তনাদসহ অবর্ণনীয় মর্মান্তিক সেই দৃশ্য। সেদিন রাজধানীর প্রতিটি হাসপাতালে আহতদের তিল ধারণের জায়গা ছিল না।

ভাগ্যগুণে নারকীয় গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্য শেখ হাসিনা বেঁচে গেছেন দেখে তার গাড়ি লক্ষ্য করে ১২ রাউন্ড গুলি করা হয়। তবে টার্গেট করা গুলি বঙ্গবন্ধুকন্যাকে বহনকারী বুলেটপ্রুফ গাড়ি ভেদ করতে পারেনি। হামলার পরপরই শেখ হাসিনাকে কর্ডন করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তার তৎকালীন বাসভবন ধানমন্ডির সুধা সদনে।

রক্তে ও আর্তনাদে ভারী বঙ্গবন্ধু এভিনিউ

২১ আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। পরে সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ জনে। রক্তাক্ত-বীভৎস ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান ছাড়াও সেদিন নিহত হন ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, হাসিনা মমতাজ রিনা, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মোশতাক আহমেদ, লিটন মুনশি, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসির উদ্দিন, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম।  ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ গুরুতর জখম নিয়ে ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মেয়র ছাড়াও আরও কয়েকজন শরীরে গ্রেনেডের স্পিন্টার নিয়ে বেদনার সঙ্গে অনেকদিন লড়াই করে পরবর্তী সময়ে পরাজিত হন।

হামলায় আওয়ামী লীগের চার শতাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়ে শরীরে স্পিন্টার নিয়ে আজও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আহত হয়েছিলেন বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা। এখনও অনেক নেতাকর্মী সেদিনের সেই গ্রেনেডের স্পিন্টারের মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। অনেক নেতাকর্মীকে তাৎক্ষণিক দেশে-বিদেশে চিকিৎসা করালেও তারা এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি।

এদিকে গ্রেনেড হামলার পর ভয়, শঙ্কা ও ত্রাস গ্রাস করে ফেলে গোটা রাজধানীকে। এই গণহত্যার উত্তেজনা ও শোক আছড়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। হামলার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজে বাঁচতে ও অন্যদের বাঁচাতে যখন ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ঠিক তখনই পুলিশ বিক্ষোভ মিছিলের ওপর বেধড়ক লাঠি-টিয়ার শেল চার্জ করে। একইসঙ্গে নষ্ট করা হয় সেই রোমহর্ষক ঘটনার যাবতীয় আলামত। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যক্ষ মদদে ওই ঘটনা ধামাচাপা দিতে ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।

গণহত্যার বিচার

দুই দশক পর করুণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় মামলাটি নিয়েছে নতুন মোড়। ২০১৮ সালের রায়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট সম্পূর্ণ রায় বাতিল করে সব আসামিকে খালাস দেয় ষড়যন্ত্রমূলক রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে সরানোর পর আদালতে অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত অভিযুক্তরা ক্ষমতাধর হয়ে পড়ার পরে হাইকোর্ট থেকে আসল নতুন রায় — সব আসামী খালাস।

নির্বাচিত সরকার অপসারণের পর হাইকোর্টের বিচারকদের বরখাস্তের জন্য সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও করেও সফলতা পেয়েছে ২১ আগস্টের অপরাধীদের সমর্খকরা। বিচারাঙ্গনের এমন বাস্তবতায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আগামী ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে রায় ঘোষণা করবে ঘোষণা দিয়েছে। আপিল শুনানি শেষে আজ তারিখ নির্ধারণ হয়েছে।  ভিকটিমরা বিচার পাবে কি না এখনো দেখার অপেক্ষা।

জজ মিয়া নাটক ও বিচারপ্রক্রিয়া

বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে তথাকথিত ‘জজ মিয়া নাটক’ দিয়ে তদন্ত ভেজানোর অভিযোগ বহুবার উঠেছে। একই সঙ্গে আল-কায়েদা–সংলগ্ন হুজি-বি জঙ্গি চক্রের সংশ্লিষ্টতার কথাও তদন্তে আসে। ট্রাইব্যুনাল ২০১৮–তে রায়ে রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার ও পরিকল্পিত আক্রমণের কথা স্পষ্ট করে। ২০২৪-এর খালাস–রায়ে এসব প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায়, আর আপিল বিভাগ এখন দেশজুড়ে দৃষ্টি কেড়েছে।

রাজনীতির নতুন পটভূমিতে 

আগস্ট ২০২৪–এ শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও আন্তঃকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভে এক বক্তৃত্তায় ইউনূস রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটাতে তাদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের কথা স্বীকার করেন।

ইউনুসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে চালু হয়েছে মবতন্ত্র, গণপিটুনিতে হত্যা, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের নতুন সংস্কৃতি। গত জুনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তথাকথিত ‘মব’কে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

আওয়ামী লীগ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি স্পষ্ট: বিচার ও আইনের শাসন। ২১ বছর পরও তারা অপেক্ষা করছেন—খালাস নাকি পুনর্বিচার, নাকি দণ্ড বহাল। তবে ৪ সেপ্টেম্বরের রায় সবকিছু ঠিক করবে না; রাষ্ট্র ন্যায়বিচারের পথে ফিরবে কিনা জনগণই তা ঠিক করবে।

spot_img