সিনেমায় চুম্বন নিয়ে দেশে দেশে যত কাণ্ড

বলিউড থেকে মরক্কো, পাকিস্তান থেকে কাতার — সিনেমার চুম্বন দৃশ্য নিয়ে আলোচিত ঘটনা।

ভারত: চুম্বনের বিরুদ্ধে সেন্সর

গতমাসে ভারতে ‘সুপারম্যান’ সিনেমা মুক্তি পেলেও মুক্তি পায়নি একটি চুমুর দৃশ্য। আকাশে ভাসমান অবস্থায় চুম্বনের দৃশ্যটি সহ্য করতে পারেনি দেশটির ফিল্ম সেন্সর বোর্ড। এটি “অত্যধিক কামুক” বলে কেটে দিয়েছে।

তবে সমালোচনা হচ্ছে পক্ষে-বিপক্ষে। অনেকেই বলছেন – কাটাকাটি, মারামারি ও নির্মম সহিংসতার দৃশ্যগুলো সহ্য করা যায়, অথচ একটি সরল চুম্বনের দৃশ্য সহ্য হয় না! চুম্বন নিয়ে মানুষের এমনই সংবেদনশীলতা!

বলিউডে চুম্বন নিয়ে বিতর্ক কম নয়। ১৯৭৮ সালে রাজ কাপুরের ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’-এ চুম্বন দৃশ্য দেখানোর পর তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এটিকে ‘অপমানজনক’ বলে তিরস্কার করেন এবং এমন দৃশ্য কেটে ফেলতে ক্যাম্পেইন চালাবেন ঘোষণা দিয়েছিলেন।

২০০৬ সালে ঐশ্বরিয়া রায় ও হৃত্বিক রোশনের ‘ধূম ২’ ছবির চুম্বন দৃশ্য নিয়ে মধ্যপ্রদেশের এক আইনজীবী রীতিমত মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন। মামলায় অভিযোগ, এমন চুমু ‘নারীর মর্যাদা নীচে নামিয়ে দিচ্ছে’।

২০০৭ সালে হলিউডের তারকা রিচার্ড গিরের শিল্পা শেঠিকে জনসভায় চুম্বন করার ঘটনাটিও একই দাবিতে আলোচিত হয়েছিল।

উল্লেখ্য, ভারতে এখনো জনসম্মুখে চুম্বনকে অশ্লীলতা বলে গণ্য করা হয়। ২০০৫ সালে এক বিবাহ অনুষ্ঠানে চুম্বন করায় এক ইসরায়েলি দম্পতিকে জরিমানা দিতে হয়েছিল।

পাকিস্তান: সীমারেখা টানা প্রেম

পাকিস্তানে রূপালী পর্দায় প্রেমিককে চুম্বন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নজর’ সিনেমায় পাকিস্তানি অভিনেত্রী মীরা এবং তার ভারতীয় সহ-অভিনেতা অশমিত প্যাটেলের মধ্যে একটি চুম্বন দৃশ্য দেখানোর পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

নজর” সিনেমাটি কিন্তু পাকিস্তানের ছিল না। এটি একটি ভারতীয় হিন্দি ভাষার থ্রিলার চলচ্চিত্র। কিন্তু পাকিস্তানি মেয়ে ভারতে অভিনয় করতে গিয়ে নায়কের সাথে চুমাচুমি — পাকিস্তানবাসী কিভাবে একে ভালোভাবে নেয়?

অজ্ঞাতনামা সরকারি মুখপাত্রের বরাত দিয়ে দেশটির মিডিয়া লেখে, পাকিস্তান এটিকে ‘ইসলামিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিরোধী’ মনে করে। বলা হয়, পাকিস্তানি অভিনেতাদের বিদেশেও ‘অশ্লীলতা ছড়ানো’ থেকে বিরত থাকতে বলেছে সরকার।

পাকিস্তানের সেন্সর বোর্ড নিশ্চিত করেছে সে দেশে সিনেমায় আদৌ কোনো চুম্বন দেখানো হয় না। অথচ নাচ-গানের দৃশ্যে কমতি নেই। তবে একজন ভারতীয় হিন্দু নায়ককে মীরার চুমু দেওয়ার ঘটনা অনেক উত্তাপ ছড়ায়। জঙ্গিরা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় — এক সাধারণ চুম্বন-দৃশ্য হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক শিরোনাম।

মধ্যপ্রাচ্য: প্রেম নিষেধাজ্ঞার স্বরূপ

মধ্যপ্রাচ্যে একটি সুপ্ত চুম্বন দেখালেই সমস্যা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে আমেরিকান অভিনেত্রী ব্লেক লাইভলির অভিনীত ‘ইট এন্ডস উইথ আস’ সিনেমা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কাতার সরকার। কারণ শুধুমাত্র একটি চুমুর দৃশ্য।

ঠিক একই সময়ে, ডিজনির ‘লাইটইয়ার’ অ্যানিমেশনেও একটি ছোট সমকামী চুম্বনের কারণে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য এক ডজনেরও বেশি দেশে প্রদর্শিত হয়নি। এমনইভাবে বহু আরব দেশে আটকে আটকে গিয়েছিল ‘বারবি’ ছবি। ছবিটিতে এলজিবিটি ও নারীবাদী ভাবনা ফুটে ওঠায় আপত্তি।

এই অঞ্চলে প্রেম-প্রকাশকে প্রায়শই বাধাগ্রস্ত করতে হয় — কিছু ছবির ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে দৃশ্য কেটে দেওয়া হয় এবং কিছু আবার বয়কট হয়ে যায়।

ইরান: শাস্তির আতঙ্ক

ইরানে যৌন সংস্পর্শ পুরোপুরি নিষিদ্ধ – দেশজুড়ে চুম্বন দৃশ্য অনেক বছর যাবত অশ্লীলতা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সম্প্রতি এক রিয়েলিটি শো-তে কয়েক সেকেন্ডের একটি চুম্বনের দৃশ্য অজান্তে প্রচারিত হওয়া মাত্র রাষ্ট্রীয় টিভি ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছে।

সেখানে আইন এতোই কঠোর যে ২০১৬ সালে কুর্দি পরিচালক কেওয়ান কারিমি তার ছবি “ড্রাম”-এ একটি চুম্বনের দৃশ্য দেখানোর দায়ে তাঁর ছয় বছর কারাবাস ও ২২৩ চাবুকের সাজা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীকালে সাজার মেয়াদ কমেছে, কিন্তু চাবুকের পরিমাণ ছিল অপরিবর্তিত।

মরক্কো: জনসাধারণের চুম্বন কাণ্ড

সব বিতর্ক পর্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে মরক্কোর টাঙ্গিয়ারে ইতালীয় নির্মাতারা জনসাধারণের মধ্যে একটি প্রেম-দৃশ্য শ্যুট করার পর সমালোচনার মুখে পড়েন। প্রচার ভিডিওতে দেখা যায় দুই নায়ক-নায়িকা জনসমক্ষে চুম্বন করছেন, পেছনে আজানের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

দেশীয় দর্শকরা এই দৃশ্য দেখে ‘শহরের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় লঙ্ঘিত’ হয়েছে বলে প্রতিবাদ জানান। ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় — একটি সরল চুম্বন-দৃশ্য বিষম বিবাদ তৈরি করে।

spot_img