ওরা ”বড় হলে ভুল বুঝতে পারবে, তখন নিজেরাই লজ্জিত হবে,” বললেন ওয়াকার

‘গালাগালিতে অখুশি হওয়ার কিছু নেই’—নির্বাচনকে সামনে রেখে পেশাদারিত্বে জোর সেনাপ্রধানের। তদন্তে নৈতিক স্খলন-রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা; ‘সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল’ নয়, পেশাদারিত্ব বজায় রাখার নির্দেশ।

ঢাকা সেনানিবাস থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান কটূক্তি ও অপপ্রচার প্রসঙ্গে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, অপ্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে।

“যারা এসব করছে তারা আমাদের সন্তানের বয়সী; বড় হলে ভুল বুঝতে পারবে, তখন নিজেরাই লজ্জিত হবে”—মঙ্গলবার সকালে ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ অনুষ্ঠানে সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি এ কথা বলেন, বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র দ্য ভয়েস-কে নিশ্চিত করেছে।

সেনানিবাসে আয়োজিত এই বৈঠকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সশরীরে, আর সব সেনানিবাস ও জাতিসংঘ মিশনে থাকা কর্মকর্তারা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। সূত্র জানায়, প্রায় ৩৮ মিনিট বক্তব্যের পর তিনি প্রায় এক ঘণ্টা প্রশ্নোত্তর করেন। আইএসপিআর আনুষ্ঠানিক কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়নি; একজন কর্মকর্তা দ্য ভয়েস-কে জানান, এটি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম।

নির্বাচন, নিরপেক্ষতা ও ‘প্রতিশোধ পরিহার’

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সেনাবাহিনী সরকারের অনুরোধে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সহযোগিতা করবে—এ কথা পুনর্ব্যক্ত করে সেনাপ্রধান বলেন, মাঠে দায়িত্ব পালনের সময় ‘পেশাদারিত্ব’ ও ‘ধৈর্য’ই মূল। প্রতিশোধমূলক কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া চলবে না। সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারবেন না বলেও তিনি সতর্ক করেন।

একজন সদস্যের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে তদন্ত চলছে; প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা হবে। নারীনির্যাতনের অভিযোগে আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে; “নৈতিক স্খলনকে ছাড় দেওয়া হবে না, তবে কোনো মিডিয়া ট্রায়ালও হবে না,” মন্তব্য করেন জেনারেল ওয়াকার।

তিনি বলেন, একজন সেনা কর্মকর্তাকে গড়ে তুলতে রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে—তাই অপরাধে জড়ানোর আগেই কমান্ডারদের সতর্ক ও তদারকি বাড়াতে হবে, নইলে “পরে বাড়ি পাঠানোটা রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।”

প্রাণহানি এড়াতে বাড়তি সতর্কতা

সেনাপ্রধান নির্দেশনায় বলেন, সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচারে জড়িয়ে কেউ যেন উসকানিমূলক আচরণ না করে। বিভ্রান্তিকর বার্তার যথাযথ নথিবদ্ধকরণ ও প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি ‘সঠিক সময়ে’ পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন।

জিজ্ঞাসাবাদ বা মব নিয়ন্ত্রণ—যে প্রেক্ষাপটেই হোক—প্রাণহানি বা আহত হওয়ার ঘটনা যেন না ঘটে সে বিষয়ে তিনি বিশেষ সতর্কতা চান। বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ‘in aid to the civil power’ নীতির আওতায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করে আসছে।

দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন, জনসম্পর্ক ও বাহিনীর ইমেজ

অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় মাঠে দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠনের পাশাপাশি বাহিনীর ইমেজ, চেইন অব কমান্ড ও পেশাদার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে—“মানুষ এখন আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ।”

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন; মেয়াদ তিন বছর। (ISPR) তিনি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে বলেছিলেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গ্রেপ্তার ও নিখোঁজের অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে; এর প্রেক্ষাপটে আগামীর নির্বাচনে বাহিনীর নিরপেক্ষ ও সংযত আচরণকে অনেকেই ‘নির্ধারক’ হিসেবে দেখছেন।

spot_img