আলাস্কা শীর্ষ বৈঠকে যুদ্ধবিরতি হয়নি—তবু ‘অগ্রগতি’ দেখছেন ট্রাম্প-পুতিন

তিন ঘণ্টা আলোচনা; কিয়েভ-ন্যাটোকে ব্যাখ্যা করার আশ্বাস, তবে যুদ্ধ থামানো নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

অ্যান্কোরেজ (আলাস্কা), ১৫ আগস্ট — তিন ঘণ্টা মুখোমুখি আলোচনার পরও ইউক্রেনে যুদ্ধ থামাতে কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়নি। তবুও বৈঠককে “খুব ফলপ্রসূ” বলে বিবেচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

ট্রাম্প বলেন, “অনেক বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি… কিন্তু চুক্তি হয়নি। ‘চুক্তি তখনই, যখন চুক্তি হয়’।” বৈঠক শেষে তাঁরা সাংবাদিকদেরকে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য দিলেও প্রশ্ন নেননি।

বৈঠকটি হয় অ্যান্কোরেজের জয়েন্ট বেস এলমডর্ফ-রিচার্ডসনে—শীতল যুদ্ধের স্মারক এই ঘাঁটিতেই দুই নেতা বসেন। আকাশে যুদ্ধবিমান, পেছনে বরফঢাকা পর্বতশ্রেণি—সব মিলিয়ে নিরাপত্তা ও প্রতীকের এক কড়া বার্তা। এটাই ২০১৯ সালের পর দুই নেতার প্রথম সরাসরি শীর্ষ বৈঠক এবং রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর পুতিনের প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ।

কে ছিলেন, কে ছিলেন না

মার্কিন পক্ষের দলে ছিলেন সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও ও রাশিয়া বিষয়ে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ; রুশ দলে ছিলেন ইউরি উশাকভ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আমন্ত্রণ না দেওয়ায় কিয়েভ ও ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতে আশঙ্কা আছে—ইউক্রেনকে পাশ কাটিয়ে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, তিনি বৈঠকের অগ্রগতি জেলেনস্কি ও ন্যাটো নেতাদের জানাবেন।

জেলেনস্কি আলাদা বার্তায় বলেন, “ন্যায্য শান্তি”র পথ খুলতে হলে রাশিয়াকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কিয়েভের অবস্থান অপরিবর্তিত—ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন নেই; প্রয়োজন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও রাশিয়ার বাস্তব পদক্ষেপ।

যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা

কথোপকথনের দিনই দ্নিপ্রোপেত্রভস্ক অঞ্চলে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত ও আরেকজন আহত হন—ঘটনাটি বৈঠকের আড়ম্বরের মাঝেই যুদ্ধক্ষেত্রের নিষ্ঠুর বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়।

জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) সর্বশেষ আপডেটে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ইউক্রেনে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে—কমপক্ষে ১,৬৭৪ জন নিহত-আহত। বিশেষজ্ঞদের মতে, রুশ ‘গ্লাইড বোমা’ হামলা বেড়ে যাওয়ায় এই সংখ্যা আরও উর্ধ্বমুখী।

আলোচনার রূপরেখা ও বিতর্ক

বৈঠকের আগে কূটনৈতিক মহলে ধারণা ছিল—রাশিয়া বর্তমান ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ বন্ধ করা, ন্যাটো সম্প্রসারণে সীমারেখা টানা এবং কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে সমঝোতার বার্তা দিচ্ছে; পাশাপাশি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু এসব প্রস্তাবই ইউক্রেন ও ইউরোপের বহু দেশের কাছে অত্যন্ত বিতর্কিত।

আরেকটি নৈতিক-আইনি মাত্রাও আছে—ইউক্রেনের শিশুদের অবৈধভাবে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। মস্কো অভিযোগ অস্বীকার করে এবং আইসিসিকে অগ্রাহ্য করে। তবু এই পরোয়ানাই শীর্ষ বৈঠকের ‘ইমেজ’ নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে।

‘হেলসিঙ্কি’র স্মৃতি

২০১৮ সালের হেলসিঙ্কি শীর্ষ বৈঠকে ট্রাম্পের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ব্যাপক সমালোচনা ডেকে এনেছিল। ফলে এবারের আলাস্কা বৈঠকে হোয়াইট হাউস সংযত বার্তা বজায় রাখে—সংক্ষিপ্ত বিবৃতি, সীমিত প্রশ্নোত্তর। কিন্তু ‘কে লাভবান হল’—প্রশ্নটি আবারও ওঠে। কূটনীতিকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০১৮-তেও রাশিয়ার এলিটরা বৈঠককে পুতিনের প্রতীকী বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

সামনে কী

ট্রাম্প বলেছেন, বৈঠকের অগ্রগতি নিয়ে তিনি জেলেনস্কি ও ন্যাটো নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন। তিন পক্ষের (মার্কিন-রুশ-ইউক্রেন) আরেকটি বৈঠকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়নি; তবে যুদ্ধবিরতির ভৌগোলিক রেখা, বন্দি বিনিময়, নিষেধাজ্ঞা, ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা—সবই এখনো অমীমাংসিত। যুদ্ধ চলতে থাকলে যে কোনো চুক্তিই ভবিষ্যৎ আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এ নিয়ে সতর্ক করছে কিয়েভের মিত্ররা।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles