১৫ আগস্ট ও ৫ আগস্ট: বাংলাদেশে দুই অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সাদৃশ্য ও শিক্ষা

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা থেকে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার উৎখাত—দুই ঐতিহাসিক তারিখ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমননীতি ও গণতন্ত্র ধ্বংসের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর মিল বহন করে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এবং ৫ আগস্ট ২০২৪—এই দুই তারিখ গভীর দুঃখ, রক্তপাত এবং গণতান্ত্রিক ধারার বিপর্যয়ের প্রতীক। প্রায় অর্ধশতাব্দীর ব্যবধানে ঘটলেও এই ঘটনাগুলো বৈশিষ্টগতভাবে বিস্ময়কর মিল বহন করে। উভয় ক্ষেত্রেই একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে, ক্ষমতা দখলের পরপরই দমননীতি চালু হয়েছে, এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেকে গেছে।

. রাষ্ট্রের নেতৃত্বের পতন ও ক্ষমতা দখল

  • ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট: ভোরের অন্ধকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে সামরিক বাহিনীর একটি অংশ। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সরকারের পতন ঘটে, এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসে সামরিক অভ্যুত্থানকারীরা।
  • ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়। নির্বাচিত সরকারের বদলে অস্থায়ী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পায়, যা গণতান্ত্রিক ধারাকে ব্যাহত করে।

. রাজনৈতিক দমননীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন

  • ১৯৭৫: ক্ষমতা দখলের পরপরই বিরোধী কণ্ঠ রোধে গ্রেফতার, নিয়ন্ত্রণ, কণ্ঠরোধ, রাজনৈতিক অত্যাচাও ও হত্যা বাড়ে।
  • ২০২৪: মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই শত শত মানুষ নিহত হয়, হাজারো মানুষ আহত হয়, এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালানো হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানায়, ৫ থেকে ৮ আগস্টের মধ্যে অন্তত ৩১৮ জন হত্যার শিকার হন। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানায়, ৪ আগস্ট থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে  ২,০১০টি সহিংস ঘটনার নথি রয়েছে।

. বিদেশি প্রভাব ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

  • ১৯৭৫: অনেক গবেষক ও রাজনীতিবিদ মনে করেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পেছনে ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা ছিল।
  • ২০২৪: বিরোধী পক্ষের অনেক নেতা ও পর্যবেক্ষক অভিযোগ করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উত্থানে আন্তর্জাতিক শক্তি, বিশেষত পশ্চিমা দেশ ও বিদেশী লবিস্টদের ভূমিকা রয়েছে।

. জনগণের ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা

  • ১৯৭৫: জাতি স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে হঠাৎই আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হয়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
  • ২০২৪: সারা দেশে নিরাপত্তাহীনতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা জনমনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সরকার সমর্থকদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হচ্ছে।

. গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিপর্যয়

  • ১৯৭৫: নির্বাচিত নেতৃত্বকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন চালু হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে।
  • ২০২৪: নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে অন্তর্বর্তী সরকার বসানো হয়, যা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক ধারাকে ভেঙে দেয় এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তোলে।

উপসংহার

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ ও ৫ আগস্ট ২০২৪—দুই তারিখই বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় থাকবে। একটিতে দেশের স্থপতিকে হত্যা করে স্বাধীনতার পথকে রক্তে রঞ্জিত করা হয়েছিল, অন্যটিতে গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। উভয় ঘটনারই শিক্ষা এক—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও আইনের শাসন দুর্বল হলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বিদেশি হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।

লেখক: দস্তগীর জাহাঙ্গীর, সম্পাদক , দি ভয়েস

spot_img