মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দুইটি বৃহদাবয়ব মালবাহী জাহাজ কিনতে যাচ্ছে মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার। এ জন্য খরচ হবে প্রায় ৭৬.৬৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯৩৬ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) নিজস্ব অর্থায়নে এ জাহাজগুলো কেনা হবে।
প্রায় ৫৫ থেকে ৬৬ হাজার ডেডওয়েট টনেজ (DWT) ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ দুটি কিনতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি’র (Hellenic Dry Bulk Ventures LLC) কাছ থেকে, যা ভেতরে ভেতরে চুড়ান্ত হয়ে গেছে।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির (CCGP) বৈঠকে দেওয়া হয়েছে অনুমোদন।
সরকার বলছে, উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে এই জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দরপত্রে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়, যার মধ্যে কারিগরি মূল্যায়নে দুইটি প্রতিষ্ঠানকে গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। সবশেষে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি নির্বাচিত হয়।
গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক
যদিও সরকার দাবি করছে এটি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হচ্ছে, এই জাহাজ কেনার বিষয়টি এতদিন গোপন ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কর্মকর্তা পূর্বে এ তথ্য প্রকাশ করেননি। আজকের বৈঠকে সরাসরি প্রস্তাব উত্থাপন করে অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে এই অতি ব্যয়বহুল ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা ও সামগ্রিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক মহলে ধারণা, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তির অংশ।
সমালোচকরা বলছেন, সংবিধান বহির্ভূত এই অন্তর্বর্তী সরকার যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করার পরিবর্তে প্রতিদিন নিত্যনতুন নানা বিষয়—যার মধ্যে আর্থিক লাভালাভ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও রয়েছে—নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে, যা জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে।
সরকারের পক্ষে যুক্তি
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই জাহাজগুলো বিএসসির বার্ষিক পণ্য পরিবহন সক্ষমতা ১২ লাখ টন বাড়াবে, প্রায় ১৯০ কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা আনবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি রাজস্ব ও লভ্যাংশ আয়ও বৃদ্ধি করবে।
এই অনুমোদন এমন সময়ে এলো, যখন গত বছরের আগস্টে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে।
বর্তমানে হাসিনা ভারতে নির্বাসিত এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ। এদিকে, ড. ইউনূস ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রমজানের আগে, জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, স্বচ্ছতা ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সরকারের ব্যয়বহুল জাহাজ কেনার এই সিদ্ধান্ত আরও বিতর্ক ও নজরদারি বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যান্য প্রকল্প অনুমোদন
আজ সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।
এই বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিআইডব্লিউটিএর বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশ আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন প্রকল্প-১ (চট্টগ্রাম-ঢাকা-আশুগঞ্জ ও সংযুক্ত নৌপথ খনন এবং টার্মিনালসম আনুষঙ্গিক স্থাপনা নির্মাণ) (২য় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের প্যাকেজ নম্বর বিআর ডব্লিউটিপি-ডব্লিউ২-০১, বিআর ডব্লিউটিপি-ডব্লিউ৩-০১ অ্যান্ড বিআর ডব্লিউটিপি-ডব্লিউ১-০২–এর অবশিষ্ট কাজ বাস্তবায়নে সরকারি ক্রয় পদ্ধতিতে সম্পাদনের অনুমোদন দেওয়া হয়।

