ঢাকা, ১২ আগস্ট — বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে পাটপণ্য আমদানিতে আরও একটি বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত। এবার চারটি নতুন পণ্য—পাটের বস্তা ও ব্যাগ, ব্লিচড ও আনব্লিচড বোনা কাপড়, এবং পাটের সুতা/কর্ডেজ/দড়ি—স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি।
সোমবার ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর (DGFT) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এসব পণ্য এখন থেকে কেবল মুম্বাইয়ের নভার শেভা সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি করা যাবে।
এর আগে গত ২৭ জুন একই ধরনের এক আদেশে কাঁচা পাট, পাটের রোল, পাটের সুতা এবং বিশেষ ধরনের কাপড় স্থলপথে আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ভারত। এ নিয়ে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের পণ্যে এ ধরনের বিধিনিষেধ দিল প্রতিবেশী দেশটি।
বাংলাদেশের ৯৯ % পাটজাত পণ্য ভারতীয় স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি হতো—বিশেষ করে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে। এখন সেটা বন্ধ হওয়ায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
আগের সিদ্ধান্ত ও বাড়তি কড়াকড়ি
মে মাসে ভারত স্থলপথ দিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক, কাঠের আসবাব, সুতা ও সুতার উপজাত, ফল ও কোমল পানীয় আমদানিতে বিধিনিষেধ দেয়। এরও আগে এপ্রিল মাসে ভারতের কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সুযোগ বাতিল করে দেয় তারা।
জুনের নিষেধাজ্ঞার পর এখনকার সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ থেকে ভারতের বাজারে পাটপণ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের আমদানিকারকরা সাধারণত কলকাতাভিত্তিক এবং সহজে স্থলপথে পণ্য আনার সুবিধা দু’দেশের জন্যই লাভজনক ছিল। এখন নভার শেভা হয়ে পণ্য আনতে গেলে পরিবহন ব্যয় চারগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে, সময়ও দ্বিগুণ লাগছে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রউফ গণমাধ্যমকে বলেন, ভারতের এমন অশুল্ক বাধার আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। সে বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, “এ সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য ‘সাপে বর’ হতে পারে।”
বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সংগঠনের সভাপতি রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ভারতের বাজার ধরে রাখা বাণিজ্যিকভাবে সম্ভব নাও হতে পারে। তার মতে, এখনই ইউরোপ ও আমেরিকার বাজার লক্ষ্য করে পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, মান উন্নয়ন এবং মূল্য সংযোজনের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার।
অর্থনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশের পাট ও পাটপণ্য রপ্তানির প্রায় ৯৯ শতাংশই স্থলপথে ভারতে যায়। এর মধ্যে অধিকাংশ পণ্য বেনাপোল–পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে রপ্তানি হয়। স্থলপথ বন্ধ হওয়ায় সমুদ্রপথে পণ্য পাঠাতে হলে সময় ও খরচ উভয়ই বাড়ছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভারতের ক্রেতারা বাংলাদেশের তুলনামূলক সস্তা পাটপণ্য কেনার আগ্রহ হারাতে পারেন, ফলে বাজার সঙ্কুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, নভার শেভা হয়ে পণ্য পাঠাতে হলে শুধু সমুদ্রপথের ভাড়া নয়, কলকাতায় পৌঁছাতে অতিরিক্ত রেল বা সড়ক পরিবহন খরচও যুক্ত হচ্ছে। এতে একদিকে লাভের পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, চীনে সফরকালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এক বক্তব্যের পর থেকেই দিল্লি ক্ষুব্ধ। ওই বক্তব্যে তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে ‘ল্যান্ডলকড’ বা স্থলবেষ্টিত বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশকে এ অঞ্চলের ‘সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক’ হিসেবে আখ্যা দেন। দিল্লি এ মন্তব্য ভালোভাবে নেয়নি বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
ভবিষ্যৎ করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প বাজার খোঁজা, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানি কৌশল জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে স্থলবন্দর ব্যবহারের সুযোগ পুনরুদ্ধার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাপস প্রামানিক জানান, “এক একটি করে বাতিগুলো নিভে যাচ্ছে—এভাবে চললে ক্ষতি হবে।” তিনি বলছেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এই অবস্থা বদলানো উচিত।

