ছয় জেলায় সাত খুন; রংপুরে শ্বশুর–জামাইকে গণপিটুনিতে হত্যা

ছয় জেলায় একদিনে সাত জনকে হত্যা; রাজনৈতিক সহিংসতার ছায়ায় চলছে মব-রাজত্ব। ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সেনা-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সারাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অরাজকতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের বুড়িরহাট বটতলায় শনিবার রাতে ভ্যানচোর সন্দেহে বিয়ে ঠিক করতে আসা দুই আত্মীয়কে পিটিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয় জনতা। নিহতরা হলেন কুর্শা ইউনিয়নের ঘনিরামপুর গ্রামের জুতা সেলাইয়ের মিস্ত্রি রূপলাল দাস (৪০) এবং মিঠাপুকুর উপজেলার বালুয়াভাটা গ্রামের ভ্যানচালক প্রদীপ দাস (৩৫)—যিনি রূপলালের ভাগনির স্বামী।

পরিবার জানায়, রূপলালের মেয়ে নূপুর দাসের বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করতে তারা শনিবার সন্ধ্যায় রওনা হন। প্রদীপ নিজ গ্রাম থেকে ভ্যানে করে এসে রূপলালকে কাজীরহাট এলাকায় ফোনে ডাকেন। সেখান থেকে দু’জন একসঙ্গে ঘনিরামপুরের দিকে রওনা হন। রাত ৯টার দিকে বটতলা এলাকায় স্থানীয় কয়েকজন ভ্যানটি থামিয়ে জেরা শুরু করেন।

সন্দেহ থেকে গণপিটুনি

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভ্যানে থাকা বস্তা থেকে চারটি প্লাস্টিকের বোতল বের করা হয়। একটি বোতলের ঢাকনা খোলার পর গন্ধে দুই ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে খবর ছড়ায়। এলাকায় কয়েকদিন আগে এক শিশুকে হত্যা করে ভ্যান চুরির ঘটনার কারণে উত্তেজনা আগে থেকেই ছিল। ফলে সন্দেহ দ্রুত ক্ষোভে রূপ নেয় এবং জনতা দুইজনকে মারধর শুরু করে।

গণপিটুনির একপর্যায়ে তাদের বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অচেতন অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। রাত ১১টার দিকে পুলিশ উদ্ধার করে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে রূপলালকে মৃত ঘোষণা করা হয়। গুরুতর আহত প্রদীপকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে রোববার ভোরে তার মৃত্যু হয়।

তারাগঞ্জ থানার ওসি এম এ ফারুক জানান, এ ঘটনায় অন্তত ৭০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

শোক ও ক্ষোভ

রূপলালের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ভারতী দাস বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন। বৃদ্ধা মা লালিচা দাস বুক চাপড়ে কাঁদছেন—“মোর বেটা চোর না, সারা জীবন জুতা সেলাই করে সংসার চালাইছে। এভাবে ওরে কেডা নিলো?”

নিহতদের স্বজনরা বলছেন, এটি কেবল ভুল সন্দেহ নয়, বরং বর্তমান আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির ফল।

একই দিনে আরও পাঁচ খুন

শনিবার, রংপুরের তারাগঞ্জে শ্বশুর–জামাইকে গণপিটুনির ঘটনাসহ সারা দেশে মোট ছয় জেলায় সাতটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, যা দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলা সংকটের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

সিলেটের গোলাপগঞ্জ:
শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কদমতলী এলাকায় যুবদলের সাবেক নেতা রনি হোসেন (২৯)কে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ রাজুর একটি পরকীয়া সম্পর্ক প্রকাশ করায় রনিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে রনি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে রাজুর বিরুদ্ধে একটি পোস্ট দেন, যা স্থানীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে।

কুমিল্লার তিতাস:
এক্সকাভেটর চালক মো. নজরুল ভূঁইয়া (৩৫)কে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ চার টুকরো করে খালে ফেলা হয়। পুলিশ বলছে, নজরুলের সঙ্গে অভিযুক্ত নারী স্মৃতি আক্তার-এর পরকীয়া সম্পর্ক ছিল, যা হত্যাকাণ্ডের কারণ হতে পারে। স্মৃতি ও তার স্বামী মো. হোসেন মিয়া হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দুটি দেহাংশ উদ্ধার করা হয়েছে, বাকিগুলোর সন্ধানে ডুবুরি ও স্থানীয় জেলেদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

কক্সবাজারের পেকুয়া:
শনিবার রাত দেড়টার দিকে শীলখালী ইউনিয়নের এক বাড়িতে ঢুকে জসীম উদ্দিন (৫০)-কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের পরিবারের দাবি, প্রবাসী ছেলের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে স্থানীয় এক পক্ষের সঙ্গে বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পেকুয়া থানার ওসি মো. সিরাজুল মোস্তফা জানিয়েছেন, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করা হয়েছে এবং পূর্বশত্রুতার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রাজশাহীর দুর্গাপুর:
শনিবার সকালে হোজা অনন্তকান্দি গ্রামে ওয়াজেদ আলী (৭০)-কে প্রতিপক্ষের হামলায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ওয়াজেদ একটি পুরনো হত্যা মামলার ৭ নম্বর আসামি ছিলেন এবং সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পান। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্বশত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। হামলার সময় ওয়াজেদের স্ত্রী ও ছেলে গুরুতর আহত হন।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ:
এখানে মো. দুলাল মিয়া (৪৫) নামে এক ওয়ার্কশপ মালিকের মাথা থেঁতলানো মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, দুলাল মিয়া নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ স্কুলসংলগ্ন একটি কক্ষে পাওয়া যায়। এই ঘটনায় ওই কক্ষের ভাড়াটিয়া ইমন ও তার স্ত্রী সুমিকে আটক করা হয়েছে। হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার ফলে স্থানীয় বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব একত্রে সহিংস অপরাধের হার বাড়িয়ে তুলছে।

রাজনৈতিক পটভূমি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সেনা-সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, ওই তিন দিনের মধ্যে অন্তত ৩১৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশু রয়েছে। বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বলছে, ৪–২০ আগস্টের মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ ও সহিংসতার ২,০১০টি ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রশ্রয়ে দলীয় জনতা আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ব্যবসায় হামলা চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত থেকেও থামায়নি। আদালত প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর হামলা, সাংবাদিক ও শিক্ষক নিপীড়ন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে প্রশাসন দলীয়করণের অভিযোগও উঠেছে।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা, প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল এবং সচিবালয়ে প্রবেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে স্বাধীন সংবাদ প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।

সহিংসতার ধারাবাহিকতা

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে অন্তত ১১৯ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে এমন সহিংসতায় প্রায় ৬৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা শূন্যতা, গুজব, এবং রাজনৈতিক উসকানি এই সহিংসতার প্রধান কারণ।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অপরাধীদের রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ, ঘটনাসমূহের দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের শাস্তি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসচেতনতা ছাড়া এ প্রবণতা থামানো সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দৃষ্টিতে সহানুভূতি দেখিয়ে একটি অংশকে বিচারের দায়মুক্তি দিলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে না।

spot_img