এনায়েতপুরে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের এক বছর: ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত শহীদদের পরিবার

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের নৃশংস হামলায় নিহত হয় সকল পুলিশ সদস্য – এক বছর পেরিয়েও পরিবারগুলোর অপেক্ষার অবসান হয়নি, অপরাধীরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে

সিরাজগঞ্জ থেকে—

বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায় রচিত হয়েছিল এক বছর আগে; ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত থানাপাড়া এলাকার এনায়েতপুর থানা চত্তর ঐদিন হয়ে উঠেছিল জঙ্গিদের নারকীয়তার মুক্তমঞ্চ। হাজারো উন্মত্ত জঙ্গির হামলায় থানার সমস্ত পুলিশ সদস্য নির্মমভাবে হতাহত হন। প্রাণ হারাণ ওসি-এসআই থেকে কনস্টেবল – মোট ১৫ জন পুলিশকর্মী। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর এতো বড় মর্মান্তিক আঘাত এর আগে দেখা যায়নি।

গতকাল সেই নৃশংস মব হামলার এক বছর পূর্ণ হলেও শহীদ পুলিশ সদস্যদের পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের আশায় আজও পথ চেয়ে আছে। রাষ্ট্র এখনো এই হত্যাকাণ্ডের জন্য অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়নি।

৪ আগস্ট ২০২৪-এ ঘটে যাওয়া ওই ভয়াল দিনের স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের। “আমার স্বামী এক বছর আগে থানায় ডিউটিতে গিয়েছিলেন। ফিরলেন লাশ হয়ে,” বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত কনস্টেবল হাফিজুর ইসলামের স্ত্রী রোকসানা আক্তার। “খুনিদের শাস্তি দেখতে পারব কিনা জানি না,” বিলাপ করেন তিনি।

রোকসানার মতো সকল স্বজনের আজ একই প্রশ্ন – এত বড় হত্যাকাণ্ডের বিচার আদৌ হবে তো? সরকার কিছু আর্থিক অনুদান দিলেও বিচার কবে হবে কেউ বলতে পারছে না, ভয়েসকে বলেছেন রোকসানা। “আমার ছোট ছেলেটা এখনও বাবার জন্য অপেক্ষা করে,” বলতেই তার গলা ধরে আসে।

এনায়েতপুরের শহীদ পুলিশদের পরিবারগুলো এভাবেই কান্না ও ক্ষোভ নিয়ে একটি বছর পার করেছে – বিচার তো দূরের কথা, এখনও চার্জশিট পর্যন্ত দাখিল হয়নি।

ভয়াল ৪ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতের জন্য দেশি-বিদেশী অর্থায়নে ইসলামপন্থী, জঙ্গি,  প্ররোচনাকারী, জামায়াতসহ পাকিস্তানপন্থী বিভিন্ন দল ও গ্রুপ, সমমনা বৃহৎ বিরোধী দল বিএনপি, প্রলুব্ধ বামপন্থী, বিক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত সাধারণ মানুষ এবং সেনাবাহিনীর কিছু অংশসহ বিভিন্ন মহল সহিংস আন্দোলনে নেমে দেশজুড়ে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

সেই প্রেক্ষাপটে ৪ আগস্ট, ২০২৪ দেশের নানা স্থানে সহিংসতা চরমে ওঠে। সিরাজগঞ্জ  হয়ে উঠেছিল আন্দোলনকারীদের সেদিনের সহিংসতার অন্যতম বড় কেন্দ্র।

সকাল থেকেই লাঠিসোটা ও দেশি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শহরের রাস্তাঘাট দখলে নিয়েছিল সংগঠিত বিভিন্ন গ্রুপ। পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের খবর আসছিল বিভিন্ন এলাকা থেকে।

এনায়েতপুর থানায় উত্তেজনা শুরু হয় দুপুরের দিকে। ঘটনার ২১ দিন পর পুলিশের দায়েরকৃত এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, দুপুর ১২টার দিকে খোজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শত শত কর্মী-সমর্থক থানার সামনে জড়ো হয়। থানা ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রাজ্জাক মাইকে ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করেন।

“এই থানা আপনাদের – অনুগ্রহ করে থানার কোন ক্ষতি করবেন না,” ওসি রাজ্জাক অনুরোধ জানান জনতাকে। তার উদাত্ত আহ্বানে প্রাথমিকভাবে কাজও হয়; ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণভাবেই সরে যেতে শুরু করে বলে এজাহারে উল্লেখ আছে।

কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ও এজাহার অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর হঠাৎ স্থানীয় আওয়ামী লীগবিরোধী লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালায় থানায়।

হামলাকারীদের সমর্থনপুষ্ট হয়ে মুহাম্মদ ইউনুস ক্ষমতা দখলের পর দায়েরকৃত ফরমায়েসি এজাহারে দাবি করা হয়, “আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতা আহমদ মোস্তফা খান বাচ্চুর নেতৃত্বে ৫-৬ হাজার দুর্বৃত্ত” থানাটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং হামলা শুরু করে।”

তবে আওয়ামী লীগ নেতারা এই অভিযোগকে মিথ্যা ও হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কারণ ঐ সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাই ছিলেন হামলার শিকার। অনেক স্বাধীন সূত্রও বলছে, হামলাকারীরা মূলত ছাত্র আন্দোলনকারী ও বিরোধী দলীয় উগ্রপন্থী – জামায়াতে ইসলামী, ছাত্র শিবির কর্মী ও বিএনপি-সমর্থিত যুবক – যারা শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানোর জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক বলেন, “বাচ্চু (আওয়ামী লীগ নেতা) সেখানে ছিল বলে আমরা দেখিনি; বরং বহু অচেনা তরুণকে দেখেছি, মাথায় পট্টি বাঁধা, কেউ কেউ জামায়াত-শিবিরের স্লোগান দিচ্ছিল।”

হামলাকারীরা থানায় ইট-পাটকেল ছুড়তে শুরু করলে পুলিশ আত্মরক্ষায় টিয়ারগ্যাস ছোঁড়ে। কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমবেত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা বিপুল সংখ্যায় সম্মিলিত হয়ে পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা থানা ভবনে ঢুকে যায় এবং ভাঙচুর ও লুটপাট করে ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়।

দুর্বৃত্তরা প্রথমে থানার পুলিশ কোয়ার্টার এবং ওসির বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করে, ফলে ভবন জুড়ে আগুন ছড়িয়ে যায়। আগুন দেখে ভেতরের পুলিশ সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং যে যেভাবে পারেন, জীবন বাঁচাতে ছুটতে শুরু করেন। কিন্তু বাইরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও ভয়ঙ্কর পরিণতি।

জান বাঁচাতে বেরিয়ে আসা পুলিশ সদস্যদের এক এক করে ধরে ফেলে বিএনপি-জামায়াতের সংগঠিত সহিংস মোব। শুরু হয় নৃশংস গণ-পিটুনি আর হত্যাযজ্ঞ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্বৃত্তরা লাঠি-রড দিয়ে পেটাতে পেটাতে পুলিশদের মাটিতে ফেলে এবং মাথা থেঁতলে হত্যা করে।

এক সাংবাদিকের ভাষ্য: “ওরা পুলিশদের মাথায় এমনভাবে আঘাত করছিল, দেখে মনে হচ্ছিল মেরে ফেলেই ছাড়বে।” থানার আশপাশে আতঙ্কে যে যেদিকে ছুটেছে, সেখানেই তাদেরকে পিটিয়ে লাশে পরিণত করা হয়।

হামলার পরে পাওয়া ছবি ও প্রতিবেদনে উঠে আসে হত্যাকাণ্ডের বিভৎস্য চিত্র: একজন পুলিশ কর্মকর্তার নিথর দেহ কাছের একটি গাছের ডালে রশি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। থানার পাশের পুকুরেও ভাসছিল পুলিশ সদস্যদের লাশ। তিন জনের মরদেহ উদ্ধার হয় পুকুর থেকে। আরও আটটি রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায় থানা-সংলগ্ন মসজিদের পাশে স্তূপ করে রাখা অবস্থায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা নিহত পুলিশদের পোশাক পর্যন্ত ছেড়ে দেয়নি – অনেকের দেহ আধা-বিবস্ত্র ছিল, মাথা ও শরীর জুড়ে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন।

নারী কনস্টেবল রেহেনা পারভীন থানায় ডিউটিতে ছিলেন; হামলাকারীরা তাকে মারধর ও শ্লীলতাহানি করে, যদিও সৌভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

বিকেল গড়াতে সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতাল ও মর্গে পাঠায়। কিন্তু তখন পর্যন্ত ১৩ জন পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়েছেন।বাকি আহতদের মধ্যে দুই জন হাসপাতালে মারা যান, ফলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ জনে।

থানার সমস্ত কর্তব্যরত পুলিশকর্মীই সেদিন প্রাণ হারান অথবা গুরুতর জখম হন – বাংলাদেশের ইতিহাসে পুলিশের জন্য এ এক নজিরবিহীন ট্র্যাজেডি।

আরও ১২ হত্যা

সিরাজগঞ্জ জেলায় সেদিন আরও বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সহিংসতা ঘটানো হয়েছিল। এনায়েতপুরের ১৫ পুলিশ হত্যার পাশাপাশি রায়গঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা করে ৬ জনকে হত্যা করে আন্দোলনকারীরা।

রায়গঞ্জ প্রেসক্লাবে বসে নিউজ লিখছিলেন সাংবাদিক প্রদীপ ভৌমিক। তাঁকে প্রেসক্লাব থেকে টেনে বের করে রাস্তার উপরে সর্বসমক্ষে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে জামায়াত, বিএনপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা।

সিরাজগঞ্জ শহরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয় বলে প্রতিবেদন রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরীর বাড়িতে আগুন দিয়ে ২ জনকে পুড়িয়ে মারা হয়।

সারা দেশে ৪ আগস্টের সহিংসতায় অন্তত ৯০-৯৫ জন মানুষ নিহত হন, যার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন এনায়েতপুরের এই পুলিশেরা।

নিহতরা কারা ছিলেন?

এনায়েতপুর থানায় প্রাণ হারানো ১৫ জন পুলিশই ছিলেন সেদিন ডিউটিতে থাকা বাহিনীর সকল সদস্য। তাদের মধ্যে প্রবীণ কর্মকর্তা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন নবীন কনস্টেবলও।

শহীদদের তালিকায় রয়েছেন থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি আবদুর রাজ্জাক (৪৫), সাব-ইন্সপেক্টর রইস উদ্দিন খান, তহছেনুজ্জামান, প্রনবেশ কুমার বিশ্বাস, নাজমুল হোসেন, আনিসুর রহমান মোল্লা, সহকারী উপ-পরিদর্শক ওবায়দুর রহমান, কনস্টেবল আব্দুস সালেক, হাফিজুর ইসলাম, রবিউল আলম শাহ, হুমায়ুন কবির, আরিফুল ইসলাম, রিয়াজুল ইসলাম, শাহিন উদ্দিন ও হানিফ আলী। এদের মধ্যে অনেকেই তরুণ – কারো সদ্য বিয়ে হয়েছিল, কারো শিশুসন্তান এখনও বাবার প্রতীক্ষায়।

ওসি আবদুর রাজ্জাক ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ছেলে। আট ভাইবোন ও বৃদ্ধা মায়ের দেখভালে রাজ্জাক ছিলেন সবার ভরসা। “সে সবার খুব আদরের ছিল, পরিবারে কারও অভাব হতে দিত না,” বলছিলেন রাজ্জাকের ছোট বোন মাউনজেরা আলিফ। ঘটনার পরদিন ৫ আগস্ট প্রিয় ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় গ্রামের বাড়িতে আহাজারি করছিলেন তিনি।

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “ভাইয়ের বদলি হয়েছিল, ভাবছিলাম বাড়ি আসবে… কিন্তু এখন সে আসবে লাশ হয়ে। আমার ভাইকে থানায় হামলা করে মেরে ফেলা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই – আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক, তা দেখতে চাই না।”

ওসি রাজ্জাকের বৃদ্ধা মা রিজিয়া বেগম পাথর হয়ে চেয়ে ছিলেন বড় ছেলের শোকে; সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় কোনো কথা বলার শক্তি ছিল না তাঁর।

অন্যান্য নিহত পুলিশদের পরিবারেও নেমে আসে একই বেদনার ছায়া। কনস্টেবল হাফিজুর ইসলামের মাত্র চার বছরের ছেলেটি এখনো বুঝে উঠতে পারেনি বাবাকে কেন আর দেখা যায় না; শিশুটি প্রতিদিন বাবার ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে থাকে বলে জানালেন তার মা রোকসানা।

পরিবারের বড় সন্তানেরা বাবার ইউনিফর্মটি যত্ন করে তুলে রেখেছে স্মৃতি হিসেবে। এসআই রইস উদ্দিন খানের বাবা-মা বাকরুদ্ধ; “ছেলে দেশরক্ষায় গিয়ে শহীদ হলো – এটা গর্বের, কিন্তু আমার বুড়ো বয়সে এই গর্ব নিয়ে কী করব?” অসহায় কণ্ঠে বলেন তার বাবা।

রাষ্ট্রীয় কর্তব্য

আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন দেওয়া এই ১৫ জন পুরুষ পুলিশ সদস্যকে মুাহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে যথাযোগ্য সম্মান ও শহীদের মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না।

তবে ৪ আগস্টের ঘটনার পরপরই তৎকালীন সরকার নিহত পুলিশ সদস্যদের বীরের মর্যাদায় ভূষিত করেছিল। রাষ্ট্রপতির পক্ষে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের নাম “শহীদ” হিসেবে ঘোষণা করা হয়, আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছিল, এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেও কর্তব্যে অবিচল থেকে জীবনদানকারী এসব সদস্যদের পরিবারকে সবধরনের সহায়তা দেওয়া হবে এবং “দোষীদের আইনেও আওতায় আনা হবে”। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি – শহীদ পরিবারগুলোর চোখে এখনও প্রশ্ন, তাহলে তাদের প্রিয়জনদের রক্ত কি বৃথাই যাবে?

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে?

এত বড় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর স্বাভাবিকভাবেই জোরালো তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এনায়েতপুর থানায় পুলিশ হত্যার মামলাটি এক বছরেও তদন্তই শেষ হয়নি – বিচার তো বহু দূরের কথা। ২১ দিন পর (২৭ আগস্ট ২০২৪) এ ব্যাপারে প্রথম মামলা দায়ের করা হয়েছিল, তাও প্রচণ্ড চাপের মুখে।

সরকারের পক্ষে এনায়েতপুর থানার এসআই আব্দুল মালেক হত্যা ও নাশকতার অভিযোগে মামলাটি করেন। তবে মামলার এজাহার পড়ে সবাই বিস্মিত হন: সেখানে কাউকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার বদলে স্থানীয় চারজন আওয়ামী লীগ নেতার নাম উল্লেখ করে বাকিদের ৫-৬ হাজার “অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী” বলা হয়েছে! অর্থাৎ, হাজার হাজার লোককে এক কথায় দোষী করে রাখা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত হত্যাকারীদের পরিচয় অজানা – এমনটাই উপস্থাপন করেছে পুলিশ।

মামলার এজাহারনামায় যে চার আওয়ামী লীগ নেতার নাম রয়েছে, তাদের পরিবার ও দলীয় সহকর্মীদের দাবি – এটা “বাংলার পুলিশ হইলো সওদাগর (দরিয়াদিল)” জাতীয় তামাশার শামিল। “আমাদের নেতাদের কেউ মিছিলে ছিল না, তারা নিজেরাই প্রাণভয়ে পালাচ্ছিল,” বলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আহমদ মোস্তফা (বাচ্চু)-র এক সহযোগী।

প্রকৃতপক্ষে, মামলা ও তদন্তের পুরোটাই এখন রাজনৈতিক রংপোছ দেয়া একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।

এক বছর ধরে তদন্ত “চলছে” বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হলেও, আজ অব্দি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এসে পৌঁছায়নি – এমনটাই জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফরিদ উদ্দিন। “ময়নাতদন্ত ও সিআইডির বিস্ফোরক পরীক্ষার রিপোর্ট না পাওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি হচ্ছে,” ফরিদ উদ্দিন বলেন। এটি অনেকের কাছেই অজুহাত বলে মনে হচ্ছে।

যায়যায়দিন পত্রিকাকে এক শহীদ-পত্নী রাগে-দুঃখে প্রশ্ন করেন, “১৫টা লাশের রিপোর্ট এক বছরে আসতে পারল না? তাহলে চার্জশিট হবে কবে? আমরা কি বেঁচে থাকতে বিচার দেখে যেতে পারব?” তার এই কথায় বোঝা যায়, পরিবারগুলো মনে করছে ইচ্ছাকৃতভাবেই তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতি করা হচ্ছে।

এদিকে, মামলার মোড় অন্যদিকে ঘুরে দেওয়ার তৎপরতাও স্পষ্ট। সমালোচকরা বলছেন, সামরিক-পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশে যেন “বিচারের বদলে প্রতিশোধের রাজনীতি” শুরু হয়েছে।

৫ আগস্ট ২০২৪ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগের পর ”ছাত্রদের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত” ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ চালাচ্ছে, তারা প্রথম থেকেই দাবি করে আসছে যে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় ঘটা সহিংসতাগুলো “সাবেক শাসকগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের কাজ” ছিল। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকারি তদন্ত ও গ্রেফতারের নিশানায় একচেটিয়াভাবে আওয়ামী লীগের লোকজনই পড়ছেন – আর যাদেরকে পুলিশ পিটিয়ে মারার ভিডিওতে দেখা গেছে, তারা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এনায়েতপুর থানার ঘটনার পর সিরাজগঞ্জ জেলায় বিভিন্ন সহিংসতার অভিযোগে মোট ৯টি মামলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৪টি সিরাজগঞ্জ সদর থানায়, ৩টি এনায়েতপুরে (আন্দোলনকারীদের মৃত্যুর ঘটনায়), ১টি উল্লাপাড়ায় এবং ১টি থানায় হামলা-অস্ত্র লুটের আলাদা মামলা। সব মিলিয়ে এজাহারভুক্ত আসামি ৬৭২ জন এবং অজ্ঞাতনামা আসামি ৫-৬ হাজার!

অর্থাৎ, হাজার হাজার মানুষকে আসামি বানিয়ে ফেলা হয়েছে – যা কার্যত পুরো জেলায় নিরাপরাধ মানুষদের জন্য একটি ত্রাসের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গত এক বছরে সিরাজগঞ্জ জুড়ে রাজনৈতিক সূত্রে কমপক্ষে ২৯টি মামলায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরী, সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম, সাবেক এমপি চয়ন ইসলাম, আব্দুল আজিজ, জেলা পরিষদের অপসারিত চেয়ারম্যান প্রমুখ ১৬৩ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। এই তালিকা দিনে দিনে দীর্ঘ হচ্ছে।

গত ৬ জানুয়ারি ২০২৫ সিরাজগঞ্জ আদালত সাবেক মন্ত্রী লতিফ বিশ্বাসকে এই ১৫ পুলিশ হত্যা মামলায় জড়িত হিসেবে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন, যদিও এজাহারে তার নাম ছিল না – পরে “সম্পূরক অভিযুক্ত” হিসেবে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতারা অভিযোগ করছেন, “এই মিথ্যা মামলাগুলো দিয়ে আসল অভিযুক্তদের আড়াল করা এবং আওয়ামী নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে।”

অন্যদিকে, ঘটনার প্রকৃত পটভূমি নিয়ে ভিন্ন অভিমতও রয়েছে। আন্দোলনপক্ষের লোকজন (যারা এখন ক্ষমতাসীন প্রশাসনের সমর্থক) দাবী করছে, এনায়েতপুরের পুলিশ হত্যার পেছনে আওয়ামী লীগেরই হাত ছিল – যেন তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দেশকে অশান্ত করে তুলতে চেয়েছিল। অবশ্য এই দাবীর সপক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ মেলেনি। বরং, আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ গোপনে গর্বের সঙ্গে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যও দিয়েছে।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস হওয়া একটি ভিডিওতে সিরাজগঞ্জ বিএনপির এক শীর্ষস্থানীয় নেতা তার অনুসারীদের কাছে দাবি করেন যে “আমরাই এনায়েতপুরে ১৫টা পুলিশকে মারছি, তবেই না হাসিনা পালাইছে” – তার কথা শুনে উপস্থিত জনতা উল্লাসও করে।

এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ঐ নেতার বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সরকারপক্ষ থেকে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে, যা বিচার ব্যাহত করার আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

উত্থানের পরবর্তী পর্ব: সহিংসতার রাজত্ব

এনায়েতপুরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডটি ছিল ২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সহিংস পর্যায়ের একটি চূড়ান্ত উদাহরণ মাত্র। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সময়কালে দেশজুড়ে সংঘর্ষ, প্রতিশোধ ও আইনশৃঙ্খলা ভাঙনের যে নজির দেখা গেছে, তার রেশ আজও কাটেনি। সরকারী হিসাবে ঐ আন্দোলনের সময় সর্বমোট ৪৪ জন পুলিশ সদস্য বিভিন্ন স্থানে নিহত হন – যার মধ্যে এক এনায়েতপুরেই প্রাণ যায় ১৫ জনের, এটি সর্বাধিক।

রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশে অধিকাংশ থানায় বা পুলিশ স্থাপনায় হামলা হয়েছে আন্দোলনকারীদের দ্বারা। বিক্ষোভকারীরা ঢাকায় একাধিক থানায় আগুন দেয়, বহু সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করে, রাস্তায় ব্যারিকেড গড়ে তোলে।

“আমরা বিচার চাই” – শেষ আশ্রয় ন্যায়বিচারেই

এনায়েতপুর থানার নিহত পুলিশ সদস্যদের পরিবারগুলো আজও অপেক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে বিচার পাবার আশায়। গত ৪ আগস্ট তাদের স্মরণে থানার সামনে এক অনাড়ম্বর সভায় স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন প্রায় ২০-২৫ জন স্বজন – হাতে শহীদদের ছবি আর মোমবাতি। পাশেই থানার নতুন রঙ করা ভবন, কিন্তু সেই দিনের ক্ষতচিহ্ন যেন দেয়ালেও লেগে আছে।

ওসি আবদুর রাজ্জাকের বড় ভাই ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “দেশে প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহ পালন হয়, শহীদদের ফুল দিয়ে স্মরণ করা হয় – কিন্তু যারা আমাদের ভাইকে কুপিয়ে মারল, তারা কি ধরা পড়বে না?” তার কথা শুনে পাশে থাকা অন্যান্য পরিবার প্রধানরা মর্মাহতভাবে মাথা নেড়ে সহমত জানান। “শুধু ফুল দিয়ে কী হবে? আমরা চোখের সামনে খুনিদের শাস্তি চাই,” বলেন এক শহীদ কনস্টেবলের পিতা।

এদিকে ফিসফাস শোনা যায়, পুলিশের অনেক সদস্যও ভিতরে ভিতরে ভীষণ মনঃক্ষুণ্ণ এই বিচারের বিলম্বে। এক তরুণ কনস্টেবল (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “আজ ওরা পুলিশ মেরে পার পেয়ে গেছে, কাল সাধারণ মানুষ মারতেও পিছপা হবে না। বিচার না হলে আমাদের ইউনিফর্মের সন্মান থাকবে কী করে?”

বিষয়টি নিয়ে আইন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও উদ্বিগ্ন। বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) তানভীর আহমেদ বলেন, “রাষ্ট্রের প্রতীক থানা যখন আক্রমণের শিকার হয় এবং তার কোনও বিচার হয় না, তখন তা ভবিষ্যতে ভয়াবহ উদাহরণ তৈরি করবে”।

তার মতে, রাজনীতির চাপ হয়তো তদন্তকে প্রভাবিত করছে, “কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করলে আসলে রাষ্ট্রেরই ক্ষতি – আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়বে।” দেশের সাধারণ মানুষও একই প্রশ্ন করছেন – পুলিশের মতো বাহিনীর সদস্যরা যদি বিচার না পায়, তাহলে আর কে পাবে?

সবচেয়ে মর্মন্তুদ হলো শহীদ পরিবারের ছোট ছোট সন্তানদের অবস্থা। এনায়েতপুরের হামলায় নিহত বেশ কয়েকজন কনস্টেবল-এসআইয়ের শিশু সন্তান রয়েছে, যাদের এখনও বোঝার বয়স হয়নি বাবারা আর ফিরবেন না।

সম্প্রতি রোকসানা আক্তার তার পাঁচ বছরের ছেলে-মেয়েকে নিয়ে স্বামী হাফিজুরের কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন। বাচ্চারা বাবার ছবিতে হাত বুলিয়ে বলছিল, “বাবা, উঠো না কেন?” – এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবার চোখে পানি আসে।

রোকসানা নিজেও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি শুধু আল্লাহর কাছে বিচার চাই। আর সরকারের কাছে চাই, যারা এটা করেছে তারা যেন শাস্তি পায়। আমার ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার আগেই যেন জানতে পারে, অন্যায়ের শাস্তি হয়েছে।”

সরকার অবশ্য বলছে, তারা বিচারের পথেই আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, “এনায়েতপুরসহ গত বছরের সব ঘটনায় তদন্ত চলছে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।” অথছ তার আওতাধীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৪ অক্টোবর অপরাধীদের জন্য দায়মুক্তি আদেশ জারি করে বলেছে, ‘১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত’ সময়ের ঘটনায় আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার বা বিচার করা যাবে না।

ফলে মন্ত্রীর আশ্বাসে শহীদদের পরিবারগুলোর মনে ভরসা জাগছে না। কিন্তু রোকসানা আক্তারের চাওয়া সেই শুরু থেকে একটাই: “আমরা বিচার চাই। আমার স্বামী-ভাইরা যে নির্দয়তার শিকার হয়েছে, তাদের খুনিদের ফাঁসি চাই। নইলে আমাদের চোখের পানি থামবে না, এই দেশের মাথাও হেঁট হয়ে থাকবে।” এক বছর পেরিয়েও এই দুঃখ ভারাক্রান্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের দাবি অব্যাহত রয়েছে – তাদের বিশ্বাস, ন্যায়বিচার একদিন আসবেই, নতুবা শহীদদের আত্মা কখনও শান্তি পাবে না।

spot_img