ঢাকা, ২ আগস্ট ২০২৫ —
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনী ও ইসলামপন্থী শক্তির মদদে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকে হঠিয়ে ক্ষমতা দখলের এক বছরের মাথায় আগামী মঙ্গলবার “জুলাই ঘোষণাপত্র” প্রকাশ করতে যাচ্ছে মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার।
সরকারের একাধিক কর্তাব্যক্তি আজ এই ঘোষণা দিয়েছে। সরকারি ক্ষমতা দখলের একবছর পরে এসে কি কারণে এমন ঘোষণাপত্র তৈরি করা হচ্ছে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সংবিধান বাতিলের সূচনা, না কি নামেমাত্র একটা কাগুজে দলিল হবে? এর কি কোনো আইনগত ভিত্তি তৈরি হবে? কি হবে এই ঘোষণা পত্র পাঠ করলে? ঘোষণাপত্র প্রয়োজন হলে একবছর আগের সেই সেনাসমর্থিত অভ্যুত্থানের সময় কেন তা করা হয়নি?
অন্তর্বর্তী সরকার তিন মাসের মধ্যে ভোটের ব্যবস্থা করে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে এক বছর কাটিয়ে দিল। এখন আবার কী চায়? এবার কি বিপ্লবী সরকার হবে? ইউনুস কি আসলে নির্বাচন দেবে না—এমন নানাবিধ প্রশ্ন জনসমাজে ঘুরপাক খাচ্ছে। দানা বাঁধছে সন্দেহ ও অবিশ্বাস।
ঘোষণাপত্রের উত্থান ও রাজনৈতিক পটভূমি
২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)’ নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেসবুকে ঘোষণা দেন, “জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র” ৩১ ডিসেম্বর শহীদ মিনারে পাঠ করা হবে। ছাত্রনেতাদের তৎপরতা ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের পর সরকার জানায়, ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে।
তবে সময় গড়ালেও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর ১০ মে পরামর্শক পরিষদ ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে ঘোষণা প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেয়। এবার তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জানিয়েছেন, আগামী ৫ আগস্ট ঘোষণা প্রকাশিত হবে।
বিতর্কের কেন্দ্রে সংবিধানিক স্বীকৃতি
দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্বকারী আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং বাম-মধ্যপন্থী ১৪-দলসহ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এই তৎপরতার মধ্যে নেই।
আর অন্তর্বর্তী সরকারের অনুগত রাজনৈতিক দলগুলো এই তৎপরতার সাথে যুক্ত থাকলেও তারা সবাই এই জুলাই ঘোষণার ব্যাপারে একমত নয়।
কিংসপার্টি হিসেবে কথিত এনসিপি বলছে, “জুলাই ঘোষণাপত্র” যেন নতুন সংবিধানের প্রস্তাবনায় স্থান পায়। দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “এটি সংবিধানের মৌলিক রাষ্ট্রনীতির অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।”
ঐ ঘরানার বৃহত্তম দল বিএনপি এতে দ্বিমত পোষণ করেছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল ২০১১ সালে। তাই জুলাই ঘোষণাপত্রকে আলাদা করে অন্তর্ভুক্তির দরকার নেই।” বিএনপির পরামর্শ—ঘোষণাপত্রটিকে রাজনৈতিক দলিল হিসেবে রাষ্ট্রের আর্কাইভে রাখা যেতে পারে।
জুলাই সনদ ও বাস্তবায়নের দ্বিধা
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত ৭ দফা ‘জুলাই সনদ’-এর ৬টি দফা নিয়ে সমর্থন থাকলেও ৭ নম্বর দফা—অর্থাৎ সংবিধানে স্বীকৃতি—নিয়ে বিরোধিতা অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি চায়, এই সংস্কারগুলো পরবর্তী সংসদের মাধ্যমে আইনি ভিত্তি পাক। জামায়াতে ইসলামি চায় গণভোট বা রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে।
জামায়াত নেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, “ঐকমত্যের বিষয়গুলোকে অবশ্যই আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে।” তিনি জানান, জামায়াত নিজস্ব সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি ও দেশজুড়ে সহিংসতা
সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন। আওয়ামী লীগপন্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতিতে ঘরে ঘরে হামলা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন, আদালতে আসামিদের ওপর হামলা এখন নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র।
দেশজুড়ে এ যেন ‘সেনা-মদদপুষ্ট গণবিচার’। মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনেকে গভীর উদ্বেগের কথা জানালেও এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়া ক্ষমতাসীন মহল ভবিষ্যতে তাদের অপরাধের বিচার হতে পারে ভয়ে দৃশ্যত ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরে গড়িমসি করছে। এমন বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকার ও তার সহযোগীদের জন্য ”এক্সিট পলিসি” বা পলায়নের পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
জুলাই ঘোষণাপত্র কি অসাংবিধানিক সরকার ও সহযোগীদের জন্য সেই পলায়নের পথ তৈরি করে দেবে? না কি উল্টোটা করবে? এর মাধ্যমে কি ক্ষমতা পাকাপোক্ত হবে? বোঝা যাবে ৫ আগস্টের পরে।

