পথশিশু থেকে সার্ফার
বাংলাদেশের কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের মেয়ে নাসিমা আক্তারের জীবনের গল্পটি সাহস ও সংগ্রামের এক অপরাজেয় উপাখ্যান। পথেঘাটে ভিক্ষা করতে যেতে রাজি না হওয়ায় মাত্র সাত বছর বয়সে পরিবার তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। যদি তখন সে পরিবারের কথা মানতো, হয়তো তাকে আরও ভয়াবহ কোনো পথে (হয়তো পতিতাবৃত্তিতে) ঠেলে দেওয়া হত বলে মাউই নিউজ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
তবু হার মানেনি নাসিমা। বাড়িছাড়া হয়ে কক্সবাজারের সৈকতে পর্যটকদের ছোটখাটো সামগ্রী বেচে কোনও রকমে দিন কাটাতে থাকে সে। সেই সৈকতেই একদিন তার নজরে পড়ল এক আশ্চর্য দৃশ্য: একজন মানুষ সার্ফিং বোর্ড নিয়ে বিশাল ঢেউয়ের উপর দাঁড়িয়ে ছুটে চলেছেন। মুহূর্তেই মুগ্ধ হয়ে যায় নাসিমা – এ যেন তার স্বপ্নের জগৎ। দৃঢ় পণ করে ফেলল, যে করেই হোক তাকেও ঢেউয়ের ওপর দাঁড়াতে শিখতে হবে।
সেই সুযোগ বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। কক্সবাজারে দেশের প্রথম সার্ফিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা জাফর আলমের সঙ্গে পরিচয় হল নাসিমার। জাফর আলমের কাছেই হাতেখড়ি নিল সে সার্ফিংয়ের। দিনে পর দিন সৈকতে পড়ে থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে সার্ফবোর্ড সামলানোর কসরত চালাল ছোট্ট মেয়েটি। অদম্য সাহস আর দৃঢ় মনোবলের জোরে অসম্ভব দ্রুততার সাথে সে সার্ফ করতে শিখে ফেলল।
চৌদ্দ বছর বয়স হতেই নাসিমা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে ছেলেদের সঙ্গেও প্রতিযোগিতায় নামতে শুরু করল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এক স্থানীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় কিশোরী নাসিমা সকল ছেলেকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় এবং ১০ হাজার টাকা পুরস্কার হিসেবে জিতে নেয়।
দেশের সার্ফিং জগতে তার নাম ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। সেই সঙ্গে আরেকটি কৃতিত্বও তার ঝুলিতে যোগ হয়। নাসিমা হয়ে উঠলেন দেশের প্রথম নারী লাইফগার্ড; লাইফসেভিং-এর বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রথম বাঙালি মেয়ে।
রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ভাঙার লড়াই
কিন্তু বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে একজন মেয়ের সার্ফার হওয়ার পথটা মোটেও সহজ ছিল না। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একাই তাকে এগিয়ে যেতে হয়েছে অনেকটা পথ। কক্সবাজারে তখন নারী তো দূরের কথা, অধিকাংশ পুরুষও সমুদ্রের ঢেউয়ে বিনোদনের জন্য নামত না। সেখানেই নাসিমা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম – ঘাড় পর্যন্ত লম্বা ঢোলা একটি শার্ট এবং ট্রাউজার পরে বোর্ড নিয়ে যখন সে সাগরের ঢেউয়ে চড়ত, আশেপাশে অনেকেই সেটা মেনে নিতে পারত না। তিরস্কারের শিকার হতে হয়েছে তাকে বারবার। লোকজন আঙুল তুলে বলেছে, “মেয়ে হয়ে এভাবে সমুদ্রে নামা ঠিক নয়।”
কেউ কেউ তো সমুদ্রে যাওয়ার ‘দোষে’ তাকে “বেশ্যা” বলেও অপমান করেছে। নাসিমা নিজেই বিদেশি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন। বাংলাদেশের অনেকের ধারণা ছিল মেয়েদের সার্ফিং করা “ভালো মেয়ের কাজ না” বলেছেন এবিসি নিউজ-কে। কিন্তু এসব গালমন্দ আর বিধিনিষেধকে তোয়াক্কা না করে আপন মনে প্রতিদিন ঢেউয়ের ওপর দাঁড়ানোর অনুশীলন চালিয়ে গেছে সাহসী মেয়েটি।
নাসিমার আগ্রহ ও সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ধীরে ধীরে কয়েকজন মেয়ে বন্ধু তার সঙ্গে সার্ফ ক্লাবে যোগ দেয়। কিন্তু সমাজের চাপও বাড়তে থাকে সমান তালে। কিছুদিনের মধ্যেই এলাকার রক্ষণশীল মহল – বিশেষ করে কিছু ধর্মীয় নেতারা – ঘোষণা করে বসেন যে মেয়েদের জন্য সার্ফিং “অনুচিত” কাজ এবং একে ইসলামী সংস্কৃতির খেলাফ বলে ফতোয়া দেওয়া হয়।
এই ধরণের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়ল তীব্রভাবে – অধিকাংশ অভিভাবকই তাদের কিশোরী মেয়েদের আর ক্লাবে যেতে দিলেন না। ফলাফল: ক্লাবে নাসিমা ছাড়া আর কোনো মেয়ে সার্ফার রইল না, যে ক’জন শুরুতে ছিল সবাই একে একে বিদায় নিল।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এটাই নির্মম সত্য – সার্ফিংয়ের মতো বিষয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ যেন শূন্যের কোঠায় নেমে এলো।
২০১২ সালে নারীদের খেলাধুলা বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জাতিসংঘের মহিলা বিষয়ক সংস্থার উপনির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মী পুরী এই পরিস্থিতির উল্লেখ করে বলেছিলেন, “এক সময় (বাংলাদেশের Surf Club-এ) ছেলেদের চেয়ে মেয়ের সংখ্যাই বেশি ছিল। কিন্তু surfing-কে যখন সমাজের কিছু লোক মেয়েদের জন্য অশোভন বলে দিল, তখন প্রায় সব মেয়ে ক্লাব ছেড়ে চলে গেছে। নাসিমাই একমাত্র টিকে আছে।”
পুরীর মতে, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নাসিমার প্রতিভা বিকশিত হয়ে আন্তর্জাতিক সার্ফিং তারকা হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ইঙ্গিত দেয় যে নাসিমা শুধু নিজের জন্যই লড়ছিল না, সে লড়ছিল বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনের যুদ্ধ।
একদিকে সমাজের বাঁকা চোখ, অন্যদিকে পরিবার ও জীবিকার চাপ – সব মিলিয়ে নাসিমাকে কৈশোরেই অসম্ভব সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবু তার সাফল্যের খবর দূর দূরান্তে ছড়াতে শুরু করে ওই সময়েই। বিদেশি গণমাধ্যমগুলো নজর দেয় বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে দাপিয়ে বেড়ানো এই ‘সার্ফার কন্যা’র দিকে।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য টাইমস-এ “Bangladeshi Surfer Girl Sinks Muslim Taboos” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে মুসলিম রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ভেঙে একজন অল্পবয়সী বাংলাদেশি মেয়ের অবিশ্বাস্য সার্ফিং অভিযানের গল্প তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে, মার্কিন লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন Marie Claire-এর এক প্রতিবেদনে নাসিমাকে ১৮ বছর বয়সী “গেম-চেঞ্জার” আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছিল, সে শুধুই বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার নয় – পরিবার ও সমাজের রক্তচক্ষুকে জয় করে টিকে থাকা এক বীরযোদ্ধাও বটে।
নাসিমার গল্প সাংবাদিকদের মতো চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরও নাড়িয়ে দিয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়ার সাংবাদিক-লেখক জয়মাল ইয়োগিস ২০১২ সালে কক্সবাজারে এসে সার্ফ ক্লাব নিয়ে লেখার সময় নাসিমার অসামান্য প্রতিভা ও সাহস দেখে মুগ্ধ হন। “সে ছিল ক্লাবের একমাত্র মেয়ে সার্ফার এবং ওকে নানা কটুকথা সহ্য করতে হচ্ছিল, তবু নাসিমা ক্লাবের সেরা সার্ফারদের একজন ছিল… তার মধ্যে আলাদা একটা জেদ আর আকর্ষণ ছিল,” এক স্মৃতিচারণে বলেছেন ইয়োগিস।
ইয়োগিসের লেখা পড়ে সান ফ্রান্সিসকো নিবাসী ডকুমেন্টারি নির্মাতা হিদার কেসিঞ্জার বাংলাদেশে নাসিমার খোঁজ করেন। কেসিঞ্জার বলেন, “আমি বুঝতে পারলাম, নাসিমার মধ্যে কিছু একটা আছে, নিশ্চয়ই ওর জীবনের গল্পটি দারুণ শক্তিশালী।” সত্যিই, বাস্তব জীবনের এমন অসামান্য কাহিনি চলচ্চিত্রে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন কেসিঞ্জার। তিনি এবং ইয়োগিস মিলে নাসিমাকে কেন্দ্র করে প্রামাণ্যচিত্র তৈরির কাজে হাত দিলেন।
সাফল্য যখন থমকে দাঁড়াল
শত প্রতিকূলতার মধ্যেও ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে নাসিমা আক্তার বাংলাদেশের সার্ফিং দুনিয়ায় একটি উজ্জ্বল নাম হয়ে উঠেছিল। দেশের প্রথম মহিলা সার্ফার ও প্রথম মহিলা লাইফগার্ড হিসেবে সে স্বীকৃতি পায়; আঞ্চলিক সার্ফিং প্রতিযোগিতাগুলোতে নিয়মিত পুরস্কার জিতে নাসিমা প্রমাণ করে দেয় যে মেয়েরা চাইলে ছেলেদেরও হার মানাতে পারে।
তার কৃতিত্ব নতুন কিশোরী প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে থাকে – নাসিমাকে দেখে অনেক মেয়ে সমুদ্রের সাথে নতুন করে বন্ধুত্ব করতে চায়। নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নাসিমা একবার মন্তব্য করেছিলেন, “আমি যখন সার্ফ বোর্ডে দাঁড়াই আর ঢেউয়ের উপর ভেসে থাকি, তখন নিজেকে পাখির মতো মুক্ত মনে হয়। তীরে রয়ে যাওয়া জীবনসংগ্রামের সব চিন্তা তখন ভুলে যাই।” সত্যিই, সার্ফিং ছিল নাসিমার কাছে মুক্তির স্বাদ – সমুদ্র তাকে দিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য হলেও দুঃখ-দুশ্চিন্তা ভুলে থাকার আশ্রয়।
কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সামনে এল আরেক কঠিন অধ্যায়। সামাজিক ও পারিবারিক চাপে নাসিমাকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করতে হয় এক যুবকের সাথে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অল্পবয়সে বিয়ে স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু নাসিমার ক্ষেত্রে এই বিয়ে তার সার্ফিং জীবনে বড়সড় বিরতি টেনে দিল।
বিয়ের পর তার স্বামী একেবারেই মেনে নিতে পারলেন না যে তাঁর স্ত্রী “সব মানুষের সামনে সমুদ্রে গিয়ে সার্ফিং করবে।” তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, নাসিমাকে সার্ফিং বন্ধ করতে হবে। স্বামীর কথায় নাসিমা কেঁদে কেঁদে প্রিয় সার্ফবোর্ডটা বিক্রি করে দিল – মনে হচ্ছিল সমুদ্র যেন তার হাতছাড়া হয়ে গেল।
কিছুদিনের মধ্যে তিনি মা হলেন। ঘর-সংসারের চাপে সার্ফিং তো দূরের কথা, নিজের জন্য সামান্য সময় বের করাও দুষ্কর হয়ে পড়ল। যে ঢেউ একসময় তাকে উড়িয়ে নিয়ে যেত, সেটি তখন খুব দূরের ব্যাপার হয়ে যায় নাসিমার কাছে।
দুর্ভাগ্য থামেনি এখানেই। স্বামীর সাথে তার সম্পর্ক দিনকে দিন খারাপ হতে লাগল। যে মানুষটি তার স্বপ্ন বুঝতে চাননি, সেই মানুষটি ক্রমশ অধীর ও সহিংস হয়ে উঠলেন। নাসিমা পরবর্তীতে জানিয়েছেন, তার স্বামী শারীরিকভাবেও তাকে নির্যাতন করতেন।
এক পর্যায়ে নিজের ও সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন নাসিমা – এই নিপীড়নমূলক বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বুকের মাঝে একঝাঁক যন্ত্রণা নিয়ে তিনি স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলেন, কোলে ছোট্ট শিশু সন্তান।
চারপাশের অনেকেই তার এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত বা ক্ষুব্ধ হয়েছিল, কিন্তু নাসিমা জানতেন, এটিই তার বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। খুব অল্প বয়সে তিনি আবার একা হয়ে গেলেন – তবে এবার তিনি ভীষণ একা হলেও মুক্ত।
আবারও সমুদ্রের টানে, বিশ্বদরবারে পরিচয়
স্বামীকে ত্যাগ করে একলা একজন মা হিসেবে নতুন জীবন শুরু করা মোটেও সহজ কাজ নয়। নাসিমাকে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল, কিন্তু মনের কোনে সমুদ্রের যে টানটা ছিল তা একটুও ম্লান হয়নি। কিছুটা স্থিতি ফিরতেই কক্সবাজারের সেই চেনা সৈকতে আবার পা রাখলেন নাসিমা আক্তার। অনেকদিন পর ঢেউয়ের গর্জন আর নোনাজল তাঁর সত্তাকে যেন নতুন করে জাগিয়ে তুলল।
পুরোনো বন্ধুদের সহায়তায় আবার একটি সার্ফবোর্ড জোগাড় হল। একসময় যে মেয়েটি সার্ফিং ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারত না, সে আবারও ঢেউয়ের রাজত্বে নিজেকে খুঁজে পেল। নিজ উদ্যোগে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতামূলক সার্ফিংয়েও ফিরে আসেন নাসিমা। আগের মতোই সাহস নিয়ে তরুণ ছেলেদের সাথে সমানে পাল্লা দিয়ে সার্ফ করছেন, আর পাশাপাশিই স্থানীয় ছোট মেয়ে যারা সার্ফ শিখতে চায় তাদেরও উৎসাহ দিতে শুরু করলেন – যেন আর কোনো মেয়েকে একা একা সব লড়াই করতে না হয়।
নাসিমার এই “ফিরে আসার” গল্পটাই তুলে ধরেছে হিদার কেসিঞ্জারের প্রামাণ্যচিত্র “নাসিমা”। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই চলচ্চিত্রের শুটিং বেশ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষ হয় ২০২২ সালে। (কোভিড মহামারির কারণে নির্মাণকাজ মাঝখানে স্থগিত রাখতে হয়েছিল। তাছাড়া নাসিমার নিজের জীবনের ঘটনাপ্রবাহেরও অপেক্ষা করতে হয়েছে পরিচালককে।) অবশেষে ছবিটি বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হতে শুরু করে এবং প্রশংসাও পায়।
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা আন্তর্জাতিক ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র উৎসবে “নাসিমা” সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার জিতে নেয়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ইউরোপ-আমেরিকার আরও কিছু উৎসবে এটি দেখানো হয়। আর ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে ’Nasima’ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের দর্শক অনলাইনে দেখতে পাচ্ছেন – টুবি (TUBI) প্ল্যাটফর্মে বিনামূল্যে এবং গুগল প্লে ও ইউটিউবের মাধ্যমে কেনার জন্য ছবিটি উন্মুক্ত করা হয়েছে।
“নাসিমা এবং সার্ফ ক্লাবের অন্য মেয়েরা সবার জন্য রোল মডেল, কারণ তারা তাদেরকে বাঁধিয়ে রাখা সামাজিক দেয়ালগুলি ভেঙে বেরিয়ে আসছে,” বলে মন্তব্য করেছেন সহ-প্রযোজক ইয়োগিস। তিনি আশা করেন নাসিমার গল্পটি যারা দেখবে তারা অন্যায় সংস্কারগুলোকে প্রশ্ন করতে এবং সাহসের সাথে নিজ নিজ স্বপ্ন অনুসরণ করতে অনুপ্রাণিত হবে।
ছবিটির বিশেষ স্ক্রিনিং যেখানেই হচ্ছে, সেখানেই আলোচনার মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে – আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে তহবিল সংগ্রহ, কারণ নাসিমার গল্প এখানে শেষ নয়, তার সামনে নতুন লক্ষ্য।
নতুন প্রজন্মের পথপ্রদর্শক
আজ, শিরোনামে আসার প্রায় এক যুগ পরও, নাসিমা আক্তার তার নিজস্ব ঢঙে ঢেউয়ের সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। জীবিকা বা পারিবারিক দায়িত্ব – কোনো কিছুই তাকে সার্ফ-বোর্ড থেকে পুরোপুরি দূরে রাখতে পারেনি।
যদিও একাকী মা হিসেবে দরিদ্র সমাজে তাঁর জীবনযাত্রা এখনও সংগ্রামময়, নাসিমা আশাবাদী দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকাচ্ছেন। এখন তার বয়স আনুমানিক ২৫ বছর (জন্মনিবন্ধন না থাকায় সঠিক হিসাব নেই)। বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জেনেছেন, সাহস আর সুযোগ পেলে মেয়েরাও সমুদ্র জয় করতে পারে। তাই তিনি স্থির করেছেন, নিজের অর্জিত জ্ঞান তিনি পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের মাঝে ছড়িয়ে দেবেন।
এই লক্ষ্য নিয়ে কক্সবাজারে একটি অল-গার্লস সার্ফ ক্যাম্প বা সার্ফিং স্কুল খুলতে চান নাসিমা আক্তার। যেখানে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের কিশোরীরা বিনামূল্যে সার্ফিংয়ের প্রশিক্ষণ পাবে, তাদের পরিবারকেও নাসিমা বোঝাতে চান যে মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ায় সমাজেরই লাভ।
এই স্বপ্ন পূরণের জন্য ইতিমধ্যে পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্র “নাসিমা”র প্রতিটি প্রদর্শনীতে তহবিল তোলা হচ্ছে নাসিমার স্বপ্নের সার্ফ ক্যাম্প গড়ার জন্য। বিদেশের অনেক দর্শক, বিশেষ করে সার্ফিং সম্প্রদায়ের মানুষরা, অর্থ দান করে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন।
নাসিমার আশা, এটি সফল হলে বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য প্রথম সার্ফিং স্কুলগুলোর একটি হবে – এমন একটি জায়গা যেখানে সমুদ্রের ঢেউ আর সমাজের চাপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেয়েরা নির্ভয়ে নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারবে।
সহ-প্রযোজক ক্রিস্টিন গুন্থার দ্য মাউই নিউজ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা আশা করছি ‘নাসিমা’র গল্পটি একটা সাহসের ঢেউ তুলে দেবে – বিশ্বের নানা দেশ-কাল-ধর্মের সার্ফারদের মধ্যে একটা সংযোগ ও মমত্ববোধ জাগাবে।” মূল কথা, নাসিমার দেখানো পথে এখন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও একটু একটু করে বদলানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
নাসিমা আক্তারের জীবনের বিস্ময়কর এই অধ্যায় আমাদের শেখায়, ইচ্ছাশক্তি আর সাহস থাকলে তলানি থেকে শুরু করেও মহাসাগরের ঢেউ জয় করা যায়। একসময় যে সমাজ তাকে “খারাপ মেয়ে” বলে তিরস্কার করেছে, সেই সমাজেই আজ তিনি একটি পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার নাসিমা প্রমাণ করেছেন – মেয়েরা চাইলে সাগরের মতো অফুরন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রেও নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে। এখন নাসিমার হাত ধরে একঝাঁক কিশোরী সার্ফবোর্ড (surfboard) নিয়ে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখছে। ঢেউয়ের সাথে এই লড়াইয়ে নাসিমা জিতেই চলেছেন, আর তাঁর জয়ে ভর করে এগিয়ে আসছে পরবর্তী প্রজন্মের আরও অনেক সাহসিনী।

