মার্কিন পাল্টা শুল্কে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

নতুন মার্কিন “প্রতিশোধমূলক” শুল্কের বোঝা নিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত অনিশ্চয়তায়। ৩৫% মোট শুল্কহার এড়াতে অতিরিক্ত শুল্ক ২০%-এ নামিয়ে আনায় সরকার কূটনৈতিক জয় বলছে, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন বিনিময়ে দেওয়া অর্থনৈতিক ছাড় ও গোপন শর্তগুলো ভবিষ্যতে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

চলতি আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশকে গড়ে ৩৫% শুল্ক গুনতে হবে। ১৫% সাধারণ শুল্কের সঙ্গে নতুন করে ২০% “প্রতিহিংসামূলক” শুল্ক যোগ হয়ে এই হার দাঁড়াচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বাস্তবায়িত এই উচ্চ শুল্কহার বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য গুরুতর হুমকি, বিশেষত দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পের জন্য।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিগুণেরও বেশি শুল্কভার বাংলাদেশের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং মার্কেটে প্রতিযোগিতাক্ষমতা হ্রাস করবে। “যুক্তরাষ্ট্র এত উচ্চ শুল্ক বসালে আমাদের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, রপ্তানি বিপদে পড়বে,” বলে আশঙ্কা করেছেন শীর্ষস্থানীয় নিটওয়ার রপ্তানিকারক আবদুল ওয়াদুদ।

বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক; এ খাতে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয় এবং মোট রপ্তানি আয়ের ৮০% এর বেশি আসে এই খাত থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্য কেনার বৃহত্তম বাজারগুলোর একটি – গত বছরে প্রায় $৮ বিলিয়ন মূল্যমানের পণ্য (এর মধ্যে $৬ বিলিয়নের বেশি পোশাক) যুক্তরাষ্ট্রে গেছে। সুতরাং, নতুন ৩৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রপ্তানিকারকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

এছাড়াও পোশাক, চামড়া ও গৃহসামগ্রীর মতো মূল রপ্তানি খাতগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে। আগে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের উপর ১৫% মাশুল লাগত – যেখানে কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের পণ্য বিশেষ বাণিজ্য চুক্তিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। এখন সেই ১৫% এর সাথে আরও ২০% অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের মূল্য-সুবিধা উবে যাচ্ছে। পোশাক শিল্প মালিকরা বলছেন, এত উচ্চ মাশুলে আমেরিকান ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে কেনা কমিয়ে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশী পোশাক শুল্কমুক্ত হলেও, যুক্তরাষ্ট্র এতদিন ১৫% শুল্ক আরোপ করত। এবার তা দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় প্রতি ১০০ ডলারের পণ্যে ৩৫ ডলার শুল্ক দিতে হবে, যা মারাত্মক প্রতিযোগিতা-অসাম্য সৃষ্টি করবে।

“৫০% শুল্ক হলে মার্কিন ক্রেতারা আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে,” গত জুলাইয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন মোস্তাফিজ উদ্দিন নামে এক রপ্তানিকারক। যদিও শেষপর্যন্ত ৫০% নয়, ৩৫% মোট শুল্ক কার্যকর হচ্ছে, তবু এই হারকে “খুব বড় চ্যালেঞ্জ” হিসেবেই দেখছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।

শেষ মুহূর্তের সমঝোতায় শুল্ক কিছুটা কমলো

অনেক আলোচনা ও অনেক ছাড়ের পর বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌঁছেছে, যাতে শুল্কহার খানিকটা নেমে আসে। প্রাথমিক ঘোষণায় বাংলাদেশি পণ্যে অতিরিক্ত ৩৭% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের কথা ছিল (১৫% এর সাথে বাড়তি ৩৭%)। দেন-দরবারের ফলশ্রুতিতে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত শুল্ক ৩৫% থেকে কমিয়ে ২০% ধার্য করতে রাজি হয়েছে।

এর ফলে মোট শুল্ক প্রায় ৩৫%-এ সীমিত থাকবে। ঢাকায় এ খবরে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে সরকার ও ব্যবসায়ী মহল। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস একে “ঐতিহাসিক কূটনৈতিক বিজয়” আখ্যা দিয়ে বলেন যে, আমাদের প্রচেষ্টায় ১৭% শুল্ক কমানো গেছে যা রপ্তানি শিল্প রক্ষায় গুরুত্বর্পূণ পদক্ষেপ।

রপ্তানিকারকরাও বলছেন, চূড়ান্তভাবে ২০% অতিরিক্ত শুল্কে রাজি করাতে পারায় সবচেয়ে খারাপ পরিণতি এড়ানো গেছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) নেতৃবৃন্দ মন্তব্য করেছেন, বাড়তি ২০% শুল্কহার মোটামুটি সহনীয় পর্যায়ে আছে, যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক দেশও একই রকম হার পাচ্ছে।

“২০% শুল্ক কিছুটা ব্যথা দেবে, তবে অনেক প্রতিযোগীর চেয়ে আমরা এখন ভালো অবস্থানে আছি,” বলে মত দেন ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের মোহিউদ্দিন রুবেল। তার কারখানা এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করে। তিনি মনে করেন, সাময়িক ক্ষতি হলেও বাংলাদেশি পণ্যের দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে টিকে থাকার সম্ভাবনা আছে।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, ৩৫% মোট শুল্ক অন্তত কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশি পণ্যের বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে দেবে, হয় ক্রেতাদের বেশি দাম দিতে হবে অথবা আমাদের মুনাফার অংশ ছাড়তে হবে। “স্বল্প-মেয়াদে কষ্ট হবেই, কিন্তু বাজার হারানোর চেয়ে সেটা মেনে নেওয়াই ভালো,” ভয়েসকে বলেছেন একজন রপ্তানি ব্যবস্থাপক।

প্রতিযোগী দেশগুলো কী হারে শুল্ক দিচ্ছে?

অতিরিক্ত শুল্ক হার ২০% নির্ধারিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সমতায় এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন “পারস্পরিক নীতির” আওতায় বিশ্বজুড়ে অনেক দেশের উপরই অনুরূপ শুল্ক চাপাচ্ছে। ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া সকলেই ২০% হার নিয়ে সমঝোতা করেছে, আর পাকিস্তান পেয়েছে ১৯%। ঢাকার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বলেছে, বাংলাদেশের হার এখন ভিয়েতনাম-শ্রীলংকা-পাকিস্তানের সমান। ফলে আমাদের আপেক্ষিক প্রতিযোগিতাক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকবে।

আশেপাশের দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হয়েছে ভারতের ক্ষেত্রে – তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছতে না পারায় ভারতীয় পোশাক রপ্তানিতে ২৫% অতিরিক্ত শুল্ক (মোট প্রায় ৪০%) কার্যকর হচ্ছে।

বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার মতো দেশ কম শুল্ক পাওয়ায় ভারত অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। গুজরাটের পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন ASSOCHAM-এর প্রধান চিন্তন ঠাক্কর বলেছেন, “প্রতিযোগীরা কম শুল্ক পাওয়ায় আমাদের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আশা করি শুল্কহার যুক্তিযুক্ত পর্যায়ে নামাতে আলাপ চালাবো” (রয়টার্স)। এরই মধ্যে ভারত নতুন করে আলোচনায় নেমেছে বলে খবর বেরিয়েছে, যদিও আপাতত তাদের ২৫% শুল্ক মেনে চলতে হবে।

অন্যদিকে চীনের ব্যাপারে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আগে থেকেই শুল্কযুদ্ধ চলছিল; নতুন ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ তালিকায় চীনের হার কী দাঁড়াবে তা পর্যবেক্ষণে আছে। যদি চীনা পণ্যে অত্যন্ত বেশি শুল্ক বসে, তাহলে আমেরিকান ক্রেতারা চীন থেকে সরে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে আরও বেশি আসতে পারেন, যা বাংলাদেশ-ভিয়েতনামের মতো দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে। তবে উল্টোদিকে, চীন তুলনামূলক কম হার পেয়ে গেলে প্রতিযোগিতা তীব্রতর হবে। সুতরাং চীনের সাথে মার্কিন আলোচনার ফলাফল বাংলাদেশসহ সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু বিশেষ বাণিজ্য সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ এই পরিস্থিতিতে বাড়তি লাভ পেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কেন্দ্রীয় ও ল্যাটিন আমেরিকার DR-CAFTA চুক্তিভুক্ত দেশ এবং আফ্রিকার AGOA সুবিধাভোগী দেশগুলো মার্কিন বাজারে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে পোশাক রপ্তানি করতে পারে।

পাকিস্তানের একটি বৃহৎ রপ্তানি প্রতিষ্ঠানের প্রধান মুসাদ্দাক জুলকারনাইন মন্তব্য করেছেন, যদি এশীয় দেশগুলোর উপর বর্তমান হারে শুল্ক চলতে থাকে তাহলে “মার্কিন বিনিয়োগ ও সোর্সিং ক্রমশ ক্যারিবিয়ান-আমেরিকান ও মিসর ইত্যাদি অঞ্চলে সরে যেতে পারে”। বাংলাদেশকেও দীর্ঘমেয়াদে এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

শুল্ক কমাতে কী কী ছাড় দিল ঢাকা?

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমানোর বিনিময়ে বাংলাদেশকে বড় অর্থনৈতিক ছাড় দিতে হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যাতে দুই দেশের বাণিজ্য অসমতা কিছুটা কমে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) খলিলুর রহমান, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী আলোচক দলের নেতৃত্ব দেন, রয়টার্সকে বলেছেন, “আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি মূলত মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির উপর কেন্দ্রীভূত করেছি। এতে একদিকে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা উপকৃত হবে, অন্যদিকে আমেরিকার কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোও খুশি হবে।” তার এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশ সুস্পষ্টভাবে গম, তুলা (কটন), সয়াবিনের মতো পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বাস্তবে গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ সরকার জরুরিভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭ লাখ টন গম আমদানির সমঝোতা স্মারক সই করে এবং তা পরবর্তী পাঁচ বছর প্রতি বছর আমদানি করবে বলে চুক্তি হয়েছে (প্রতিবছর আনুমানিক $২০০ মিলিয়নের বেশি মূল্যের গম)। সাধারণত বাংলাদেশ সস্তা গমের জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন (ব্ল্যাক সি অঞ্চল) এবং কানাডার ওপর নির্ভর করে; এখন বিশেষ ব্যবস্থায় উচ্চ মূল্যে হলেও মার্কিন গম কিনতে রাজি হতে হয়েছে।

একইভাবে ২৫টি বোয়িং যাত্রীবিমান কেনার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা – যাতে করে মার্কিন শুল্ক নীতির কুশলী হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি লাভবান হন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর নবায়নের এই আদেশটির বাজারমূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার।

তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন তেল ও তুলা আমদানিতেও বড় চুক্তি হয়েছে। চূড়ান্ত আলোচনা চলাকালে বাংলাদেশের বেসরকারি আমদানিকারকরা $১৩০ মিলিয়ন মূল্যের সয়াবিন এবং $৩০-৩৫ মিলিয়ন মূল্যের আমেরিকান কটন আমদানির চুক্তি সই করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার ডাল, ভুট্টা, এলএনজি সহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্য আমদানি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে কি-না, সে প্রশ্নও উঠেছে।

শুধু পণ্য কেনাই নয়, বাংলাদেশ নীতিগত কিছু ছাড়ও দিয়েছে। বাংলাদেশ ১০০টির মতো মার্কিন পণ্যে শুল্ক মওকুফের প্রস্তাব করেছিল, যদিও তালিকা জমা দিতে গড়িমসি হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে তা কাজে লাগেনি। আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র কিছু কঠোর শর্ত দেয় – যেমন, যে সব পণ্যে বাংলাদেশ আমেরিকাকে শুল্কছাড় দেবে তা অন্য কোনো দেশকে দিতে পারবে না, এবং যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোন দেশকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিলে বাংলাদেশকেও তাতে যোগ দিতে হবে।

এসব শর্ত WTO’র নীতির বিরোধী হওয়ায় বাংলাদেশ আপত্তি তোলে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় কিছু শর্ত শিথিল করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে আলোচনার সম্পূর্ণ বিবরণ জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়নি। গোপনীয় চুক্তির পেছনের অনেক শর্ত অজানা থেকে গেছে, যা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ ফেসবুকে লেখেন, “শুল্কছাড়ের বিনিময়ে কী কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে জনগণ জানে না। এটা নিশ্চিত যে এর বদলে আমেরিকা ওদের চাওয়া অনেক কিছুই আদায় করে নিয়েছে।” তাঁর মত, দেশের জনগণকে সম্ভাব্য “দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি” সম্পর্কে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

কিছু পর্যবেক্ষক আশঙ্কা করছেন, হয়তো কৌশলগত বা সামরিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে – যেমন মার্কিন GSOMIA বা ACSA নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর ইত্যাদি বিষয়, যেগুলো নিয়ে আগেও চাপ ছিল।

তবে সরকার এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু বলেনি। জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বিবিসি বাংলার কাছে স্বীকার করেছেন, “শুল্ক নিয়ে আলোচনা ছাড়াও অন্য অশুল্ক বাধা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক আলাপও হয়েছে”, যা থেকে বোঝা যায় আলোচনার পরিধি খুব বিস্তৃত ছিল।

কূটনৈতিক সাফল্য নাকি ব্যয়বহুল আপস?

বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়ভাবে এই সমঝোতাকে একটি কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, যা আমাদের সাহসী কৌশল ও দূরদর্শিতার জয়”। তার মতে, ২০% শুল্কহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকলো এবং বিশ্বের বৃহত্তম বাজারে প্রবেশাধিকারও বজায় রইল।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানও বলেছেন, “আমরা ৩৫% শুল্ক এড়াতে পেরেছি – এটি আমাদের কোটি শ্রমিকের জীবিকা রক্ষায় সুসংবাদ”। সরকারী ভাষ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে ক্রমাগত চেষ্টার ফলেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে এবং “আন্তরিকতার সাথে জটিল আলোচনায় সফলভাবে নেভিগেট করা গেছে”।

তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে চিত্রটি মিশ্র। ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান প্রভৃতিও প্রায় একই হার পেয়েছে; ভারত পেয়েছে বেশি (২৫%) – এদিক থেকে দেখলে বাংলাদেশ অন্তত ভারতের চেয়ে সফলভাবে দরকষাকষি করতে পেরেছে।

এটি অবশ্য লক্ষণীয় যে, ভারতের মতো বড় অর্থনীতি প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শর্ত মেনে চলতে নারাজ ছিল (যেমন মার্কিন পণ্যে সমান শুল্কছাড়, কৌশলগত চুক্তি ইত্যাদি), যার ফলে তারা চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারেনি এবং বেশি শুল্ক মেনে নিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে নিজের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে, যার ফলে চুক্তি আদায় করা সম্ভব হয়েছে – এটিকে কৌশলী বাস্তববাদ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান একে স্বাগত জানিয়েন।

অবশ্য দেশের ব্যবসায়ী মহলের একাংশ ও বিশ্লেষকরা এটিকে নিরেট সাফল্য বলতে নারাজ। তাদের মতে, শুরুতে কূটনৈতিক তৎপরতার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি এত দূর গড়িয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এপ্রিলে শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর বাংলাদেশ সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি, দরকারি লবিংও করেনি, ফলে চাপে পড়ে তড়িঘড়ি শেষ মুহূর্তে দিতে হয়েছে। “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শক্তিশালী লবিং ছাড়া সফল হওয়া প্রায় অসম্ভব… সরকার দেরি করেছে,” বলেন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির অন্যতম নেতা আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।

প্রথম ২-৩ মাস আলোচনা ঢিমেতালে চলার পর জুলাইয়ে এসে ঢাকা হঠাৎ করেই তৎপর হয়। এর মধ্যে ৯০ দিনের সময়সীমা প্রায় শেষের পথে চলে আসে, যুক্তরাষ্ট্র আস্থা হারিয়ে ৩৫% শুল্ক কার্যকরের নোটিশও দিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২৩ জুলাই বিস্তারিত পজিশন পেপার জমা দিয়ে সশরীরে আলোচনা শুরুর পর সমীকরণ বদলাতে থাকে একটা মোটামুটি ফল আসে।

আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশ্ন উঠছে, এই চুক্তির মূল্য বাংলাদেশের জন্য কতটা ভারী হলো। বড় অঙ্কের মার্কিন পণ্য কেনা ও আমদানি বাড়ানো মানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বাড়বে। ইতোমধ্যে বোয়িং বিমানের বিলিয়ন ডলার, মার্কিন গম-তুলার জন্য শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় চূড়ান্ত হয়েছে। অনেকে বলছেন, এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের চাপ বাড়তে পারে।

তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশ চাপে পড়ে যেসব আমদানি করছে সেগুলো তুলনামূলক ব্যয়বহুল – যেমন মার্কিন গম বা তুলা – যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতিচাপও তৈরি করতে পারে। অর্থনীতি গবেষক হাসান মুরশেদ মন্তব্য করেন, স্বল্পমেয়াদী স্বস্তি পেতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ বাড়তি ঋণ ও সামরিক নির্ভরশীলতার ফাঁদে পড়তে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে লিখছেন যে, “মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা দরকার” – অতিরিক্ত শুল্কের ক্ষেত্রে সামান্য ছাড় পেলাম বলে উচ্ছ্বসিত হলে হবে না। এর বিনিময়ে অন্তর্বর্তী সরকার কী দিয়েছি তাও জনগণকে জানতে হবে।

spot_img