বিশ্লেষণী সংবাদ,
সিয়াম পারভেজ, ঢাকা
গণপিটুনি দিয়ে হত্যা, বাড়িঘরে হামলা, গ্রেপ্তার, জুলুম ও নিষেধাজ্ঞাসহ সব ধরণের দমননীতি উপেক্ষা করে সংগঠিত হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। সারাদেশে ছোট-বড় বৈঠক, ঝটিকা মিছিল এবং অনলাইনে যোগাযোগ ও আলাপ-আলোচনা অব্যাহত আছে।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও দমননীতির কারণে বাংলাদেশের মিডিয়া সেসব তথ্য প্রকাশ করতে পারছে না। উপরোন্তু সেনা ও ইসলামী মৌলবাদ সমর্থিত অন্তবর্তীকালীন সরকারের আজ্ঞাবহ কিছু মিডিয়া তথ্য বিকৃত করে একধরণের পুলিশি প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এই সুযোগে সরকার বাড়িয়ে দিয়েছে দমন নিপীড়ন।
আজগুবি এক অভিযোগে আওয়ামী লীগের আরও অন্তত ২২ জন নেতা, কর্মী ও সমর্থককে গতমাসে গ্রেপ্তার করার কথা স্বীকার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেনাবাহিনীর এক মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তাকেও হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তারের পিছনে কিছু উগ্রমৌলবাদী মিডিয়ার বানোয়াট ও উস্কানিমূলক সংবাদও দৃষ্টিকটুরূপে সামনে আসছে।
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব মিডিয়ার মাধ্যমে আপত্তিকর ভাষায় প্রচার করা হচ্ছে, আটককৃতরা “সরকারবিরোধী গোপন বৈঠক, শেখ হাসিনার ‘প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা’ ও রাজধানীতে প্রশিক্ষণমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।”
অথচ সরকারের বিরোধিতা, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন এবং প্রশিক্ষণমূলক কর্মকাণ্ড কোনোটাই বেআইনি কোনো কাজ নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সংবিধান অনুযায়ী এসব করার অধিকার নাগরিকদের আছে।
ডিবি ও ভাটারা থানা-পুলিশ জানায়, ৮ জুলাই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসুন্ধরার কে বি কনভেনশন সেন্টারে ‘নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ’ একটি বৈঠক ডাকে, যেখানে প্রায় ৪০০ লোক অংশ নেন। অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা শেখ হাসিনার আহ্বানে সারা দেশ থেকে ঢাকায় লোক এনে শাহবাগ মোড় দখল করে দেশে ‘অস্থিরতা সৃষ্টি’ ও শেখ হাসিনার ‘পুনরায় ক্ষমতাসীন হওয়া’ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করেন। বৈঠকে সরকারবিরোধী স্লোগানও দেওয়া হয় বলে পুলিশের অভিযোগ।
প্রায় ৪০০ লোক কোনো সভায় সংশ নিয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দিলে সেটিকে কিভাবে গোপন বৈঠক বলা যায় তা বোধগম্য নয়। ভয়-ভীতি ও অত্যাচার নির্যাতন উপেক্ষা করেই সারা দেশে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সভা-সমাবেশ করতে হচ্ছে।
পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে সমাবেশ হয়েছে গত মাসের ৮ তারিখ। সেই সময় থেকে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী নিখোঁজ। তাদের কয়জন পুলিশ হেফাজতে আছে এক মাস যাবত মিডিয়াগুলো তা প্রকাশ করেনি।
সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পাঁচ দিন পর ১৩ জুলাই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ভাটারা থানায় মামলা করেছে পুলিশ। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ মামলটি তদন্ত করছে।
ডিএমপির মুখপাত্র উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেছেন, গ্রেপ্তারকৃত ২২ জনের মধ্যে যুবলীগ নেতা, “আওয়ামী লীগের এক নারী নেত্রী, ছাত্রলীগ কর্মী, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কনভেনশন সেন্টারটির ব্যবস্থাপক রয়েছেন। তাঁরা এখন কারাগারে।”
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপগুলো ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা, যোগাযোগ ও নিজেদের মতামত প্রকাশ করে আসছে। এটি কোনো অপরাধ নয় এবং ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপ বাংলাদেশে নিষিদ্ধও নয়। তা সত্ত্বেও তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হচ্ছে।
ডিবির অভিযোগ, “বসুন্ধরার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ‘প্রিয় স্বদেশ’, ‘এফ ৭১ গেরিলা’, ‘শেখ হাসিনা’, ‘বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম’সহ একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আবারও সংগঠিত হয়ে সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে নিয়োজিত আছে।”
পুলিশের ভাষ্যে প্রকাশিত গ্রেপ্তারকৃতদের বক্তব্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারের “ব্যানারবিহীন” ঐ সভায় দিনভর একধরনের ”রাজনৈতিক রিহার্সেল” চলছিল। সভাটি যেহেতু “ব্যানারবিহীন” সুতরাং একে সরাসরি আওয়ামী লীগের সভা বলার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়তো বলা যেতে পারে।
আওয়ামী লীগের ব্যানার ব্যবহার না করলেও দলটির সমর্থকরা নিজেরা আলাপ-আলোচনা করলে কোন আইনে বাধা দেওয়া যায় বোধগম্য নয়। “রাজনৈতিক রিহার্সেল” করলে কি অপরাধ হয় সেটাও আধুনিক বিশ্বকে বোঝানো কঠিন – বিশেষ করে যদি আপনি দাবি করেন, “আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি”।
রাজনৈতিক স্বাধীনতায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বা বেআইনি বাধা প্রদান করে মানুষকে আটকিয়ে রাখা যায় না, নির্যাতন উপেক্ষা করে সাহসীরা বের হতে শুরু করেছে – এসব সভা বা “রাজনৈতিক রিহার্সেল” বরং তারই দৃষ্টান্ত।
একটি পত্রিকা লিখেছে, বরগুনার গ্রেপ্তারকৃত যুবলীগ নেতা সোহেল রানা ও গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেত্রী শামীমা নাসরিনকে (শম্পা) মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বিভিন্ন সংস্থার তদন্তকারীরা। কনভেনশন সেন্টারে কীভাবে সংগঠনের সদস্যদের এনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল এবং শেখ হাসিনাকে ‘ঘোষণার মাধ্যমে’ ফেরত আনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল — এসব বিষয় তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের মতো গণমুখী বিশাল রাজনৈতিক দলের ক্যাডারভিত্তিক প্রশিক্ষণের সংস্কৃতি তেমন একটা নেই। গণমানুষের স্বতস্ফুর্ত সংযোগেই দলটি গড়া। তবুও যদি তারা দলীয়ভাবে কর্মীদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে তবে তা অপরাধ কর্ম নয়।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনও বেআইনী কিছু নয়। যারা ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচার করবেন বলে দাবি করছেন, তারা শেখ হাসিনা নিজে প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ নিলে উৎকন্ঠিত হওয়া বিদ্ঘুটে ব্যাপার!
তদন্ত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ফরমায়েসি মিডিয়া বলেছে, “তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এই পরিকল্পনায় জড়িত আরও ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।” তাঁরা বলছেন, “এই পরিকল্পনা ছিল সুসংগঠিত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারত।”
এসব কথায় ক্ষমতাসীনদের ”গণঅভ্যুত্থান-ভীতি” প্রকাশ পাচ্ছে। অবৈধভাবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতা দখল করে রাখা ও অন্যায় উৎপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষ জেগে উঠছে। দমনে শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
একজন সেনাকর্মকর্তাকে এর সঙ্গে জড়ানো আরেক রহস্য। আওয়ামী লীগের একটি সভার এক মাস পরে অনুগত মিডিয়াকে দিয়ে ফরমায়েসি রিপোর্ট প্রকাশ এবং তার ভিত্তিতে একজন সেনাকর্মকর্তাকে আটক করা স্বাভাবিক পরিস্থিতির ঈঙ্গিত দেয় না।
সেনাবাহিনীর মেজর সাদিকুল হক ওরফে মেজর সাদিক সম্পর্কে বলা হচ্ছে, “তিনি বসুন্ধরার ওই কনভেনশন সেন্টারে দ্বিতীয় তলা ভাড়া নিয়ে ‘রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ’ দিচ্ছিলেন।”
আওয়ামী লীগ সেনাবাহিনী দিয়ে গড়া রাজনৈতিক দল নয়। সেনাবাহিনীর সহায়তায় গড়া রাজনৈতিক দলের বিষয়ে এমন কথা বলা হলে এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতো না।
আজ (শুক্রবার, ১ আগস্ট) এক বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর জানিয়েছে, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত শেষে ওই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ চলছে।”
বিষয়টি যেহেতু সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তের বিষয়, তাই তাদের নিজস্ব তদন্ত ও বাহিনীর সদস্যের প্রতি ন্যায়বিচার জন-প্রত্যাশা। আর আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা ও দমনপিড়ন বাংলাদেশকে ক্ষতিকর পথে ধাবিত করবে। গণতন্ত্রের মুক্তি বাংলাদেশকে বাঁচাবে।

