ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার, বাংলাদেশের রংপুরে হিন্দু পল্লিতে হামলা ও ভাঙচুর

ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে কিশোরকে গ্রেপ্তারের পর বা বাংলাদেশের রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলদাতপুর ছয়আনি হিন্দুপল্লিতে হামলা চালিয়ে অন্তত ১৫টি হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে একদল উগ্রপন্থী মুসলিম জনতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস ক্ষমতাগ্রহণের পরই বাংলাদেশের সংখ্যালুঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু নির্যাতন বেড়েছে। এসকল নির্যাতনের ঘটনায় কোন ধরণের শাস্তি না হওয়ায় নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘সুপ্রভাত মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ’ বলছে, “২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৩২টি ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকান ও উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে, যার বেশিরভাগই হয়েছে ধর্মীয় গুজবকে কেন্দ্র করে।”

শনিবার (২৬ জুলাই) রাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে ‘অবমাননাকর’ মন্তব্যের অভিযোগ তুলে রনজন রায় নামে এক হিন্দু কিশোরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিশোরটি একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউশনের শিক্ষার্থী। স্থানীয়রা জানান, রনজন রায়ের নামে একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে ওই পোস্ট করা হয়, যার সঙ্গে তার বা তার পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই।

পুলিশ জানায়, রনজনকে গ্রেফতারের পর সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

তবে ঘটনার পরপরই শনিবার রাতে এবং রোববার দুপুরে আলদাতপুর ছয়আনি এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকশ’ লোক লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হিন্দুপল্লিতে হামলা চালায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ি লক্ষ্য করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে উগ্র জনতা তাদের ওপরও হামলা চালায়, এতে অন্তত এক কনস্টেবল গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় ৫০০-৬০০ জনের একটি মিছিল খিললগঞ্জ বাজার হয়ে হিন্দুপল্লিতে প্রবেশ করে। ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও সংখ্যায় কম থাকায় তারা পর্যাপ্ত প্রতিরোধ গড়তে পারেনি।

গঙ্গাচড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল এমরান বলেন, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।”

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, “ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে।”

এই ঘটনাটি দেশে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, ফেক আইডি ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

ইউনুসের আমলে হিন্দু নির্যাতনের নতুন ধারা?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুসের শাসনামলে দেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা ও নিপীড়নের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। এর আগে গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও দিনাজপুরে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা, মন্দির ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের একাধিক ঘটনা ঘটে। এখন রংপুরে এই হামলার ঘটনা প্রমাণ করছে, বর্তমান সরকারের আমলেও সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়।

 

অনেকে আশঙ্কা করছেন, ভারসাম্যহীন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক শূন্যতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের অন্ধ সমর্থনের ফলে এই ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউনুস সরকার মুখে ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা বললেও মাঠে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু কঠোর আইন নয়, প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক সচেতনতাও জরুরি।

spot_img