পাঁচ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ, আহত শতাধিক

Date:

ঢাকা — দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় মঙ্গলবার দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এর আগের রাতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষ চলে।

বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন কলেজেও উত্তেজনা ও অস্থিরতার খবর পাওয়া গেছে।

একাধিক ক্যাম্পাসে প্রায় একই সময়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন বাড়ানো হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়।

একই সময়ে কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতাকর্মীদের জড়ো হতে দেখা যায়। তবে সন্ধ্যার দিকে ওই এলাকায় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের আর দেখা যায়নি।

মঙ্গলবার রাজধানীর তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংঘর্ষেই অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এর আগের দুই দিনের ঘটনাসহ পাঁচটি ক্যাম্পাসে তিন দিনে আহতের সংখ্যা শতাধিক বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে মোট আহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের হিসাবে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক এই সহিংসতা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসকে ফের সংঘাতের স্থানে পরিণত করছে?

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষ

মঙ্গলবার সবচেয়ে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি সেমিনারকে কেন্দ্র করে সেখানে দফায় দফায় সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে প্রবেশকে কেন্দ্র করে প্রথমে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং বিকেল ও সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থেমে চলতে থাকে। একপর্যায়ে সংঘর্ষ মিলনায়তন এলাকা ছাড়িয়ে শহীদ মিনার এবং পাশের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—জকসু এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস, অস্থায়ী আবাসিক হল, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান নিয়োগসহ কয়েকটি দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে সেমিনারে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন।

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইস উদ্দিন। শিক্ষার্থীরা জানান, তারা প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে ইউজিসি চেয়ারম্যানের দৃষ্টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দাবির দিকে আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিলনায়তনে ঢুকতে বাধা দেন। এ নিয়ে প্রথমে কথা-কাটাকাটি এবং পরে সংঘর্ষ শুরু হয়।

তবে সংঘর্ষের সূত্রপাত নিয়ে দুই পক্ষ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে।

জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহিন মিয়া অভিযোগ করেন, সেমিনার শেষে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের সংগঠনের সদস্যদের ওপর হামলা চালান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ এবং জকসুর কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাও হামলার শিকার হন।

অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তার দাবি, ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো অনুষ্ঠান ব্যাহত করে ইউজিসি চেয়ারম্যানকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছিল।

সংঘর্ষের পর সাংবাদিকদের হিমেল বলেন, “তাদের ভদ্রভাবে সরে যেতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা সরে যায়নি। তারা সামনে এগিয়ে এলে সংঘর্ষ শুরু হয়।”

তিনি দাবি করেন, সংঘর্ষে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও আহত হয়েছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। আহতদের মধ্যে জকসুর সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলিম আরিফ এবং ছাত্রদল নেতা ইয়াসিন সাইফ রয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষে আহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে অন্য কিছু হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

হাসপাতালেও হামলা-সংঘর্ষের অভিযোগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষ ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

গুরুতর আহত কয়েকজনকে পাশের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেও নতুন করে উত্তেজনা ও হামলার ঘটনা ঘটে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণের বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসাধীন ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির আহত নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ পরে আহত কয়েকজনকে ওই হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নেয়।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিুল ইসলাম জানান, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আহতদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের পর সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

রাজনৈতিক সংঘর্ষ হাসপাতাল এলাকায় পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আহতদের জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা।

তদন্ত কমিটি করল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সংঘর্ষের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জরুরি সংবাদ সম্মেলনও করে। সেখানে উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইস উদ্দিন উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার এবং নতুন করে কোনো ধরনের সংঘাতে না জড়ানোর আহ্বান জানান।

তদন্ত কমিটি কীভাবে প্রথম বিরোধটি সহিংসতায় রূপ নিল, সংঘর্ষে কারা জড়িত ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ঘটনায় অংশ নিয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ

মঙ্গলবার বিকেল প্রায় ৩টার দিকে ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষে দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

এ ক্ষেত্রেও কে আগে হামলা চালিয়েছে তা নিয়ে দুই সংগঠন পরস্পরকে দায়ী করেছে।

ছাত্রদলের দাবি, তাদের নেতা পারভেজ মোশাররফকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা মারধর করার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, “জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও অর্জন” শীর্ষক একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের ব্যানার টাঙানোর সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান।

বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, সংঘর্ষে প্রায় ২০ জন শিবিরকর্মী এবং সাতজন ছাত্রদলকর্মী আহত হন। আহতদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক আবদুল মালেককে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই দিনে সংঘর্ষ হওয়ায় ঢাকা কলেজের ঘটনাটি সার্বিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে বিভিন্ন এলাকায় তৎপর থাকতে হয়।

মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় হল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ

রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াতেও ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

ঘটনার সঙ্গে আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময় দুই পক্ষের লোকজনের হাতে লাঠি ও পাইপ দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতেও দেশীয় অস্ত্র হাতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার মো. মাহফুজার রহমান মঙ্গলবার দ্য ভয়েসকে জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করলেও দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা সেখানে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিলেন।

পরে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে বলে তিনি জানান।

এ সংঘর্ষে আহত অন্তত সাতজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তাদের মধ্যে ছিলেন মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হক, ৫০; ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ; লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ও ঢাকা দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিসার উদ্দিন রাব্বি; ঢাকা দক্ষিণ ছাত্রদলের সভাপতি শামীম মাহমুদ; সমকালের মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক নাজমুল ইসলাম; লালবাগ ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের আহ্বায়ক জানে আলম এবং ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রুবেল হোসেন মোমিন।

নিসার উদ্দিন রাব্বির দাবি, তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী নন। বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে বসে থাকার সময় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা হঠাৎ লাঠি ও ইট নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।

তার এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। বৃহত্তর সংঘর্ষ নিয়ে প্রতিপক্ষের বক্তব্যও ভিন্ন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, সানাউল্লাহর দুই পা, পিঠ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত রয়েছে। রাব্বির বাঁ পায়ে ইটের আঘাত লাগে এবং পড়ে যাওয়ার সময় বাঁ হাতে আঘাত পান। সাংবাদিক নাজমুল ইসলামের পায়ে ইট লাগে। অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হক মাথায় আঘাত পান।

ঢাকা কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের সহসভাপতি রাইসুল ইসলাম, ২৪, অস্থিরতার সময় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ ঘণ্টার সংঘর্ষ

ঢাকায় মঙ্গলবারের সংঘর্ষের আগের রাতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ হয়।

জুলাই অভ্যুত্থান উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের আয়োজিত “জুলাই অ্যাগেইনস্ট অপপ্রেশন” শীর্ষক একটি প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারকে প্রদর্শনীটি আয়োজন করা হয়েছিল।

প্রদর্শনীর একটি অংশের শিরোনাম ছিল “জুডিশিয়াল কিলিং”। সেখানে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির ছয় নেতার ছবি রাখা হয়, যারা বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ওই প্রদর্শনীর বিরোধিতা করেন এবং ব্যানারটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। এ নিয়ে প্রথমে বাগ্‌বিতণ্ডা এবং পরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে অংশ নেওয়া কয়েকজনের হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র, হকিস্টিক, লোহার রড, বাঁশ ও কাঠের লাঠি দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের সড়কে যান চলাচলও ব্যাহত হয়।

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জহির রায়হান বলেন, যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের “বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার” হিসেবে দেখানোর কারণেই তারা ওই ব্যানারের আপত্তি করেছিলেন।

তার অভিযোগ, ব্যানার সরানোর দাবি জানানোর পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের ওপর হামলা চালান। এতে তাদের সংগঠনের চারজন আহত হন।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবদুর রাকিব পাল্টা অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আয়োজিত একটি প্রদর্শনী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা পণ্ড করার চেষ্টা করেছিলেন। তার দাবি, সংঘর্ষে শিবিরের তিনজন আহত হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ফেরদৌস রহমান বলেন, ছাত্রদল ব্যানারটির বিষয়ে আপত্তি জানানোর পরই বিরোধের শুরু হয় এবং পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।

পরবর্তী সময়ে দুই সংগঠনের প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর বড় ধরনের সংঘর্ষ বন্ধ হলেও মঙ্গলবার দিনভর ক্যাম্পাসে চাপা উত্তেজনা ছিল।

বাড়ছে ক্যাম্পাস সংঘাতের আশঙ্কা

সাম্প্রতিক এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘর্ষ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে এবং দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টার অভিযোগ তুলছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের ধারাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের একটি ঘটনা থেকে শুরু হয়। পরে তা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজধানীর তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। তিন দিনে পাঁচটি ক্যাম্পাসে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও কয়েকটি সংঘর্ষ হওয়ায় বিষয়টি বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ জুলাই অভ্যুত্থান নিজেই মূলত শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল।

নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে—দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো কি শিক্ষা, মতবিনিময় ও শান্তিপূর্ণ ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্র হিসেবে থাকবে, নাকি রাজনৈতিক বিরোধ আবারও শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেবে?

প্রায় প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো একে অপরকে দায়ী করেছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা ও দায় নির্ধারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সামনে এখন মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করার দায়িত্ব রয়েছে। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা প্রশাসন ও পুলিশের কাছ থেকে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং পাল্টাপাল্টি হামলা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন।

তবে কোনো রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন—এমন সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আরও মৌলিক। তারা নিশ্চিন্তে ক্লাস করতে পারবেন কি না, লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারবেন কি না, আবাসিক হলে নিরাপদে থাকতে পারবেন কি না এবং ক্যাম্পাসে চলাচলের সময় রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে পড়তে হবে কি না—সেটিই এখন তাদের বড় প্রশ্ন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Share post:

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

ঢাকার রেস্তোরাঁয় খাবারের সময় আওয়ামী লীগের ৬ নেতাকর্মী গ্রেফতার

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গুলশানে একটি রেস্তোরাঁয় খাবার গ্রহণের সময়...

বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, মৃত্যু বেড়ে ৮৬০

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বেড়ে ৮৬০ জনে পৌঁছেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় তিন শিশুর মৃত্যু এবং ১,২১৮ জনের হাসপাতালে ভর্তির তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ঢাকায় অজ্ঞাত নারীর কাটা মাথা ও দুই হাত উদ্ধার

রাজধানীর সবুজবাগে কালভার্টের নিচ থেকে অজ্ঞাত এক নারীর বিচ্ছিন্ন মাথা ও দুই হাত উদ্ধার করেছে পুলিশ। মরদেহের বাকি অংশ খোঁজার পাশাপাশি পরিচয় শনাক্তে চলছে তদন্ত।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা: ‘ভয় আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না’

নয়াদিল্লি, ৫ আগস্ট: ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে...