বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও গ্রেফতারের হৃদয়বিদারক মুহূর্ত
ড. আবদুল আউয়াল সাবেক উপাচার্য সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট, বাংলাদেশ
২৫ মার্চের রাতে ৩২ নম্বর বাড়িতে কী ঘটেছিল কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কালো রাত্রিতে ৩২ নম্বর সড়কের বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সেই মুহূর্তগুলো ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ প্রথম আলো-তে স্মৃতিচারণ করে লিখেছিলেন। রেনু, মুজিব, জামাল আর রাসেল এক ঘরে রইলেন। কেয়ারটেকার হাজী গোলাম মোর্শেদ ফোন রিসিভ করেই চলেছেন। ওই সময় বাড়িতে এলেন পাবলিক কমিশনার ডিরেক্টর তবীবুর রহমান। “মুজিব ভাই, পালান, ওরা মেরে ফেলবে আপনাকে।” মুজিব বললেন, “If they don’t get me, they will massacre all the people, all my people and destroy the city. তুমি চলে যাও। এই বাড়ি যেকোনো সময় অ্যাটাক হবে। Now leave।” একটা ফোন এলো— “রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে বলছি। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আর্মি অ্যাটাক করেছে। পুলিশ পাল্টা জবাব দিচ্ছে। ভীষণ গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে।” মুজিব বললেন, “রাজারবাগ পুলিশ লাইন অ্যাটাক করেছে? Then from now, Bangladesh is independent. আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।” রাত ১২টা। হাজী মোর্শেদ ফোন ধরে বললেন, “হ্যালো, হ্যালো—বলদা গার্ডেন থেকে বলছি, মেসেজ পাঠানো হয়ে গেছে, মেশিন কী করব?” হাজী মোর্শেদের কাছে এ কথা শুনে বঙ্গবন্ধু বললেন, “মেশিন ভেঙে ফেলে পালিয়ে যেতে বল।” পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকেরা সেই বার্তা ধরে ফেলতে পারল। পাকিস্তানি রেডিওর পাশের ওয়েভলেংথে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন মুজিব। অনুচ্চ স্বরে শোনা গেল সেই ঘোষণা— “This may be my last message. From today Bangladesh is independent.” সঙ্গে সঙ্গে চালু হয়ে গেল টেলিপ্রিন্টারগুলো। সারা দেশে বার্তা যেতে লাগল শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। টেলিগ্রাম, টেলিপ্রিন্টার, টেলিফ্যাক্সের মাধ্যমে সারাদেশে থানায় থানায় পৌঁছে যেতে লাগল ঘোষণা। চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরীর বাসায় পৌঁছে গেল বার্তা। বার্তা পেলেন কাদের সিদ্দিকী, বার্তা পেলেন সীমান্ত অতিক্রমের সময় তাজউদ্দীন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণাটি চট্টগ্রাম ওয়্যারলেসে পাঠাতে লাগলেন বিদেশি জাহাজগুলোর কাছে। ২৬ মার্চ ভোর হওয়ার আগেই চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, সিলেট, শেরপুর, বরিশাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সহ নানা জায়গায় পৌঁছে গেল সেই বার্তা। এর মধ্যেই হেলমেট পরা সৈন্যরা ধুপধাপ করে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দেয়াল টপকে ভেতরে অবস্থান নিতে লাগল। বাইরে প্রচণ্ড শব্দ—মনে হচ্ছিল যেন কেয়ামত নেমে এসেছে। একটি গুলির খোসা এসে পড়ল জামালের পায়ে, পরে রাসেলের পায়েও। সৈন্যরা বাড়িতে ঢুকেই সামনে পেল হাজী মোর্শেদকে। হাজী মোর্শেদ তখন ফোনে খবরটা দিতে চাচ্ছিলেন—“বঙ্গবন্ধুর বাড়ি অ্যাটাক।” এমন সময় আওয়াজ এলো—“Hands up!” মোর্শেদ হাত তোলার আগেই টেলিফোনের তার ছিঁড়ে সেটাকে তার মাথায় প্রচণ্ড শক্তিতে আছাড় মারল এক সেনা। তিনি শুধু শুনতে পেলেন—“মারো!” তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলেন। শেখ সাহেব দোতলা থেকে বেরিয়ে এলেন— “How dare you hit my man? I want him alive!” শেখ সাহেব এমন জোরে চিৎকার করে উঠলেন যে পাশের বাড়িতে মেঝেতে শুয়ে মোশাররফ সাহেবও তা শুনতে পেলেন। নিচতলার বারান্দায় খাঁচার ময়না পাখিটা চিৎকার করে উঠল—“হ্যালো, জয় বাংলা!” অমনি গুলি। “জয় বাংলা, জয় বাংলা” শব্দ তার দুই ঠোঁট চিরে গলার ভিতর থেকে বেরিয়ে আত্মার সঙ্গে উড়ে যেতে লাগল আকাশময়। শেখ মুজিব চিৎকার করে বললেন—“Stop fire! কী চাও?” কয়েকজন সৈনিক ছুটে যাচ্ছিল তাঁর দিকে। সিঁড়ির কাছে যাওয়ার আগেই তাদের অধিনায়ক বললেন—“কেউ গুলি করবে না।” তাঁর প্রতি নির্দেশ ছিল, শেখ মুজিবকে জীবন্ত ধরতে হবে। মেজর বললেন, “আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে, স্যার।” মুজিব বললেন, “ওকে, আমি তৈরি হয়ে আসি।” এদিকে নিচে সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুর বডিগার্ড মহিউদ্দিনকে নির্মমভাবে পিটাচ্ছিল। রেনু স্যুটকেস গুছিয়েই রেখেছিলেন। রাসেল ভীষণভাবে কাঁদছিল। সে বুঝতে পেরেছিল—আব্বা আর বহুদিন তাদের মধ্যে ফিরবেন না। কাঁদতে কাঁদতে বলছিল—“আব্বা, যাবে না তুমি।” জামাল স্যুটকেস হাতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। সৈন্যদের নেতা তাকে বলল— “Young man, sorry. তোমাদের পিতাকে তোমাদের মধ্য থেকে নিয়ে যেতে হচ্ছে।” জামাল বলল— “Behave like a human. Why are you behaving like an animal?” রেনু রাসেলের হাত ধরে পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। গাড়িতে উঠে রেণুর দিকে তাকিয়ে মুজিব বললেন—“আসি।” রেণু বললেন—“এসো, আল্লাহ ভরসা।” হাজী মোর্শেদকে পাঁজাকোলা করে আরেকটি গাড়িতে তোলা হলো। গ্রেফতার করা হলো আম্বিয়ার মা, গৃহপরিচারিকা রমা, ফরিদ, বাবুর্চি নিয়াজ, আজিজ মিয়াকেও। ফজলুল হক মুন্সি ড্রাইভার ও মনছুর ড্রাইভার বাড়ির পেছনে ছিল। গোলাগুলি শুরু হতেই তারা দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মুজিব চলে গেলেন। বাড়িতে এখন রেণু, জামাল, রাসেল আর আহত মহিউদ্দিন। মহিউদ্দিন যন্ত্রণায় কাতর। পাশের বাসা থেকে দেয়াল টপকে এলেন ডাক্তার সামাদ খান চৌধুরীর ছেলে বাবু। তিনি বললেন— “আব্বা নারায়ণগঞ্জে আটকা পড়েছেন। তিনি ফোন করে বলেছেন, আপনাদের খোঁজ নিতে। আপনাদের কিছু লাগবে কি না। আপনারা তো এখানে নিরাপদ নন। আমাদের বাসায় চলুন।” রেনু বললেন—“কিছু লাগলে জানাব।” রেণু তখন উপলব্ধি করতে লাগলেন, কী ঘটে গেছে। হাসুর আব্বাকে তিনিই আপস করতে নিষেধ করেছিলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে মানা করেছিলেন। তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এর একটাই মানে—দেশ স্বাধীন হবে, কিন্তু শেখ মুজিব হয়তো আর ফিরবেন না। শেখ মুজিব হয়তো আর ফিরবেন না— কিন্তু দেশ স্বাধীন হবেই

