‘শিশু জিহাদ’ মামলা: শেখ হাসিনাসহ ১২৪ জন খালাস

তদন্তে প্রমাণ মিলেছে ভুক্তভোগী জীবিত, ভুল তথ্যে ভিত্তিতে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল

ঢাকার একটি আদালত বহুল আলোচিত ‘শিশু জিহাদ হত্যা’ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২৪ জনকে খালাস দিয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, যাকে হত্যার শিকার বলে দাবি করা হয়েছিল—সেই জিহাদ জীবিত। ফলে মামলাটির ভিত্তিই ভেঙে পড়ে।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার জেনারেল রেকর্ডিং অফিসার (জিআরও) আবদুল নূর শুক্রবার, ২০ মার্চ এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

তদন্তে উঠে এলো গুরুতর ভুল

মামলাটির তদন্তে একাধিক বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। আদালতে দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, জিহাদ নামে যাকে হত্যার শিকার বলা হয়েছিল, তিনি আসলে নিহত হননি; বরং ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় একটি ঘটনায় আহত হয়েছিলেন।

সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে সব আসামিকে খালাস দেন। এর আগে ১১ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে সকল আসামির অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, এফআইআর, অভিযোগপত্র এবং ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটি হত্যা নয়, একটি আঘাতজনিত ঘটনা। পাশাপাশি ঘটনাস্থল নিয়েও বড় ধরনের বিভ্রান্তি ছিল। এফআইআরে কেরানীগঞ্জের বাচিলা ব্রিজ এলাকার কথা উল্লেখ থাকলেও, প্রকৃত ঘটনা ঘটে হাজারীবাগে।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বদিওয়ার রহমান বলেন, “মামলায় দুটি গুরুতর ভুল ছিল—একজন জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়েছে এবং ঘটনাস্থল ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।”

উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা—আইনজীবীদের অভিযোগ

আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলাটি একটি বিশেষ সময়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায়ের করা হয়েছিল এবং এর পেছনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রভাব থাকতে পারে।

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “একটি স্বার্থান্বেষী মহল জুলাই আন্দোলনের সময় এই মামলাটি দায়ের করেছিল। তদন্তে এখন প্রকৃত ঘটনার চিত্র সামনে এসেছে।”

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, মামলার বাদী জাহিরুল ইসলাম নাকি অন্যের প্ররোচনায় এই মামলা করেন এবং তিনি নিজেও জানতেন না যে জিহাদ জীবিত। ধারণা করা হচ্ছে, আর্থিক বা বাসস্থানের সুবিধা পাওয়ার আশায় তাকে প্রভাবিত করা হয়েছিল।

বাদীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

উচ্চপর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি ছিলেন আসামি

এই মামলায় দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আসামি ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল, সাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল মামুন।

এত উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের একসঙ্গে অভিযুক্ত করায় মামলাটি শুরু থেকেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সরকারের ইঙ্গিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাজনৈতিক নেতাদের হয়রানি করার জন্য সারাদেশে এরকম অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রশ্ন

মামলাটি এমন এক সময়ে দায়ের হয়, যখন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। ওই সময় থেকে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে যে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির ঘটনা বেড়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সেই সময়ে সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই বিরোধী মতের লোকজনের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের দুর্বল ও তথ্যভিত্তিহীন মামলা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করতে পারে এবং আইনের শাসনের জন্য তা একটি উদ্বেগজনক সংকেত।

নতুন মামলা, নতুন তদন্ত

এদিকে, জিহাদের প্রকৃত আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাজারীবাগে একটি নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে সেটির তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, সংবেদনশীল ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আরও সতর্কতা ও নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।

spot_img