বঙ্গবন্ধু কোন দলের একক সম্পদ নন, তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির সম্পদ

রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও জাতির পিতার আদর্শ ও উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবনার আহ্বান

বছর ঘুরে আবার ফিরে এসেছে বাঙালি জাতির ইতিহাসে অন্যতম ঐতিহাসিক দিন ১৭ মার্চ যেদিন জন্মগ্রহন করেছিলেন স্বাধীনতার মহান স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং বিশ্বের শোষিত বঞ্চিত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই মহানায়ক।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের দেশি-বিদেশি সেই মেটিকুলাস ডিজাইন বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর পর দ্বিতীয়বারের মত এক বৈরি রাজনৈতিক পরিবেশে বাংলাদেশে উদযাপিত হতে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী। ২০০৯ সাল থেকে সারাদেশে এই দিনটি জাতীয় শিশু কিশোর দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়েছে। কিন্ত ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার এই উদযাপন বাতিল করেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই তথাকথিত বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগে বাধ্য হন এবং এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে জাতির জীবনে দ্বিতীয় বারের মত নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার যা এখনও অব্যাহত আছে। বাঙালি জাতি এই অন্ধকার আরেকবার প্রত্যক্ষ করেছিল ৭৫’র ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শত শত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী হত্যা, জেল জুলুম, মামলা ও চরম নির্যাতনের স্বীকার হন। জেলে ভরা হয় বিরোধী দলের সকল শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে। সমগ্র দেশ পরিণত হয় একটি কারাগারে। হাজার হাজার নেতা কর্মী বাড়ি ও দেশ ছাড়া হন এবং আশ্রয় নিতে বাধ্য হন ভারত, নেপাল, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে। দেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রামের আঁতুড় ঘর বলে পরিচিত ৩২ নম্বরসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল নিদর্শন মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। উপরে ফেলা হয় বঙ্গবন্ধুর সকল ভাস্কর্য। নিষিদ্ধ করা হয় আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ এবং অনান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম।

দেশে বর্তমানে একটি ভিন্ন ও বৈরি পরিবেশ বিরাজমান থাকলেও বিশ্বের কোটি কোটি বাঙালি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধুকে যে স্বরণ করবে তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তার নমুনা ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দলমত নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের প্রাক্কালে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দিয়েছেন। বলা যায় সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেইস বুক বঙ্গবন্ধুর ছবি ও তার ওপর বিভিন্ন জনের পোস্ট করা অসাধারণ ছবি, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য নিয়ে
সয়লাব। টক শো এবং ইউটিউবে তার ওপর বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

কারণ ৭৫’র পরও ঠিক একইরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। দীর্ঘ ২১ বছর তার জন্ম ও শাহাদত বার্ষিকী পালন করতে দেয়া হয়নি, নিষিদ্ধ ছিলো তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। নতুন প্রজন্মকে বঞ্চিত রাখা হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা থেকে। তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয় স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাস।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৪৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের টিকেটে ইস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ এসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আজীবন সোচ্চার এই অবিসংবাদিত নেতাকে রাজনৈতিক জীবনে বহুবার কারাবরণ করতে হয়। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন,

১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা ও পরবর্তীতে ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং বঙ্গবন্ধু উপাধি লাভ করেন। তাঁর সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ধাপে ধাপে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হলেও তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙালি জাতির ওপর নানা নির্যাতন শুরু করে। বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। যা ইউনেস্কোর ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়াল্ড রেজিস্ট্রার এ অর্ন্তভুক্তির মাধ্যমে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। অন্যদিকে, ২৬ মাচর্ (২৫ মার্চ মধ্যরাতে) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালীর বহু কাক্সিক্ষত বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জিত হয়। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিরামহীন সংগ্রামে অবদান রাখার জন্য তিনি বিশ্বশান্তি পরিষদ প্রদত্ত জুলিও কুরি পদকে ভূষিত হন। বিবিসি’র এক জরীপে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী নির্বাচিত হন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে বঙ্গবন্ধু যখন বিভিন্নমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করতে শুরু করেন ঠিক সেই মুহূর্তে স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত শক্তি ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিরুদ্ধে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং ওই ষড়যন্ত্রেরই অংশ হিসেবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি ধানমন্ডির বাসভবনে কতিপয় সেনা কর্মকর্তার হাতে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নিহত হন। বিশ্ব গণমাধ্যমের চোখে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ক্ষণজন্মা পুরুষ। অনন্য সাধারণ এই নেতাকে ‘স্বাধীনতার প্রতীক’ বা ‘রাজনীতির ছন্দকার’ খেতাবেও আখ্যা দেয়া হয়। বিদেশী ভক্ত, কট্টর সমালোচক এমনকি শত্রুরাও তাদের নিজ নিজ ভাষায় তাঁর উচ্চকিত প্রশংসা করেন। বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তী কিউবার বিপ্ল¬বী নেতা প্রয়াত ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

শ্রীলংকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষ্মণ কাদির গামা বাংলাদেশের এই মহান নেতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু, শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তাঁর স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে। ‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনগণের নেতা এবং তাদের সেবায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাকে দেয়া বঙ্গবন্ধু খেতাবে এই দেশপ্রেমিক নেতার প্রতি দেশের মানুষের গভীর ভালবাসা প্রতিফলিত হয়।’ ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ২০১৩ সালের ৪ মার্চ নগরীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে মন্তব্য বইয়ে এমন মন্তব্য লিখেছিলেন।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মন্তব্যবইয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সম্মোহনী এবং অসীম সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর জনগণের নেতৃত্বদান করেছিলেন। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের নেতা সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন নেতা এবং রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। তিনি স্বাধীনতার জন্য প্রতিকূলতা ও বিরূপ পরিস্থিতি উপেক্ষা করে অটল সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছেন।’ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায় তার বাংলাদেশ সফরের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এসময় মন্তব্য বইয়ে তিনি লিখেন, উপ-মহাদেশের প্রতিটি মুক্তিকামী, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষের মনে বঙ্গবন্ধু এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি, স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্থপতি এবং পিতা। মমতা বলেন, বাংলা ভাষাকে বিশ্বের মঞ্চে অন্যতম শ্রেষ্ঠত্বে মর্যাদা এনে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সেই বিরল নেতা, যার প্রতি ধর্মমত নির্বিশেষে সকল মানুষ প্রণাম জানিয়ে ধন্য হয়। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিত্রিত করলেও ইতিহাসই তাঁর প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত করে যখন তাঁর এককালীন ঘোরতর শত্রু তাকে ‘মহান দেশপ্রেমিক’ হিসেবে অভিহিত করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাবেক পাকিস্তানি (বেলুচিস্তান) অফিসার মেজর জেনারেল তোজাম্মেল হোসেন মালিক পরে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘বস্তুত মুজিব দেশদ্রোহী ছিলেন না (পাকিস্তানে তাকে সেভাবে চিত্রিত করা হলেও)। নিজ জনগণের জন্য তিনি ছিলেন এক মহান দেশপ্রেমিক।’ আরেকজন সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন পাকিস্তানি জান্তার মুখপাত্র মেজর সিদ্দিক সালিক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ৭ মার্চের ভাষণের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। সালিক তার গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ঘরমুখী মানুষের ঢল নামে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল আশাব্যঞ্জক বাণী শ্রবণ শেষে মসজিদ অথবা গির্জা থেকে তারা বেরিয়ে আসছেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালো রাতে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির প্রত্যক্ষ মদদে সেনাবাহিনীর কিছু সংখ্যক উশৃংখল সদস্যদের হাতে ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়িতে সপরিবারে নিহত হন স্বাধীনতা মহান স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং বিশ্বের শোষিত বঞ্চিত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডর কারণে পলাশী যুদ্ধের পর বাংলার স্বাধীনতার সূর্য আরেকবার অস্তমিত হয়ে পড়ে। সেই সাথে স্তব্ধ হয়ে যায় দেশের শান্তি, উন্নয়ন ও অগ্রগতি। খুনী মোশতাক চক্র বাংলাদেশকে আবার স্বাধীনতার পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং 71 ‘এর যুদ্ধাপরাধীরা সদর্পে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। কুখ্যাত ইডেমনিটি অর্ডিনেন্স জারির মাধ্যমে তারা বঙ্গবন্ধু ও 15 আগস্টের অন্যান্য শহীদের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়। দীর্ঘ প্রায় 21 বছর দেশে সামরিক-বেসামরিক লেবাসে এক প্রকার স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা বিরাজ করে। এই রূদ্ধশাস অবস্থা অব্যাহত থাকে 1996 সালে আওয়ামী লীগের পুনরায় ক্ষমতায় আসার পূর্ব পর্যন্ত । এই সময়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতারে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারন নিষিদ্ধ করা হয়। আওয়ামী লীগের অগনিত নেতাকর্মীকে হত্যা ও পঙ্গু করা হয়। কারাগারে বছরের পর বছর কাটাতে হয় মুজিব আদর্শের হাজার হাজার নিবেদিতপ্রান নেতা-কর্মী। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা আবার দলের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করেন এবং দেশে গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন। দীর্ঘ ২১ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং অগণিত নেতা-কর্মীর আত্মত্যাগের পর দেশে আবার গণতন্ত্র ফিরে আসে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের শোষিত –বঞ্চিত দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যে অনেকগুলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যার ফলশ্রুতিতে দেশ আবার উন্নয়রে কক্ষে যাত্রা শুরু করে। পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরনীয় অবদানকে ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

টেলিভিশন-বেতারসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার শুরু হয়। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ সঠিক ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতির জনকের অবিস্মরণীয় অবদান নতুন প্রজন্মসহ দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে স্বমহিমায় পূনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যর্থ হয়ে যায় সামরিক-বেসামরিক স্বৈরশাসকদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরনীয় অবদানকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা। এর মাধ্যমে আবার প্রমানিত হয়েছে ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারেনা। সঠিক ইতিহাস একদিন না একদিন মানুষের কাছে উন্মোচিত হবেই। যতদিন এই পৃথিবী টিকে থাকবে ও বাঙালি জাতি বেঁচে থাকবে ততদিন পযন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে চির জাগরুক হয়ে থাকবেন তার অমর কীর্তির জন্য।

বঙ্গবন্ধু তার সকল সুখ-দুঃখকে বিসর্জন দিয়ে দেশের বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা এবং শোষিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন এবং জেলে কাটিয়েছেন দীর্ঘ ১৪টি বছর। স্বাধীনতা ও মানুষের জন্য তার এই মহান আত্মত্যাগ বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরদিন স্বর্ণের অক্ষরে জ্বলজ্বল করে লেখা থাকবে।

এই জন্যই উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবি অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতা রচনা করেছেন ও লিখেছেন—“যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরি যমুনা বহমান ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান”।

বঙ্গবন্ধু, বাংলা ভাষা, বাঙালী জাতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক ও অবিচ্ছেদ্য এবং একই সূত্রে গাথা। একটি থেকে আরেকটিকে কেউ কখনও বিছিন্ন করতে পারবে না এবং সম্ভবও নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বহু যড়ষন্ত্র ও অপচেষ্টা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মহান সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অবদানকে মুছে ফেলার জন্য। কিন্ত বাঙালি জাতি সেই যড়ষন্ত্র ও অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বার বার তার প্রতি গভীর ও অসীম শ্রদ্ধ্য এবং ভালোবাসা নিবেদনের মাধ্যমে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার বিখ্যাত “শাখী তুলির বল” কবিতায় লিখেছেন— “যতবার হত্যা করো জন্মাবো আবার, দারুণ সূর্য হবো লিখবো নতুন ইতিহাস”। এই কবিতার পংক্তির সাথে বঙ্গবন্ধুর মহান সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের যে দারুণ মিল রয়েছে তার সূত্র ধরে বলা যায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলেও তার আদর্শ ও স্বপ্নকে কেউ কোনদিন এই পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। এটাই প্রতিষ্ঠিত সত্য।

বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। তিনি কোন একটি দলের একক সম্পদ নন, এই সম্পদ সমগ্র বাঙালি জাতির। তাঁকে অস্বীকার করা মানে বাঙালি জাতি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ইতিহাসকে অস্বীকার করা। তাঁকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন মানে বাঙালি জাতি ও স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা জানানো। তাই আসুন জাতির জনকের এই জন্মদিনে আমরা সবাই তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই এবং তিনি যে সুখী, সমৃদ্ধ ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবায়নে নতুন করে শপথ গ্রহণ করি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক প্রেস মিনিস্টার।

spot_img