মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাস। ১৯৭১ সালের এই মাসেই বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, যার মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
এই ঐতিহাসিক মাসে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। কিন্তু সংসদের এই সূচনা ঘিরে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন,
এই সংসদ কি সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে ধরে রেখেছে, যার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল?
সংসদের সূচনা: জনগণ যা দেখল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। মানুষ ঘরে বসেই পুরো কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করতে পায়।
অধিবেশন শুরু হয় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। স্পিকারের আসনের ওপরে স্থাপন করা হয়েছে কালিমা, ইসলামের মূল ঈমানের ঘোষণা। এ দৃশ্য সংসদের প্রতীকী পরিবেশে নতুন ধরনের ধর্মীয় উপস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় দেশ। অতীতে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের উদাহরণ দেখা গেছে। কিন্তু এবারের অধিবেশনে কেবল ইসলামি ধর্মগ্রন্থই পাঠ করা হয়, যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কোথায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মরণ?
স্বাধীনতার মাসে শুরু হওয়া অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধ, শহীদদের স্মৃতি বা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা দেখা যায়নি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। এর স্মৃতি রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে মান্যতা পেত। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সেই ঐতিহ্য বা স্মরণ দেখা যায়নি বরং দন্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের জন্য শোক প্রস্তাব এসেছে জামাতের পক্ষ থেকে ।
শোকসভা ও সমালোচনা
সংসদে সাধারণত প্রথম অধিবেশনে শোকসভা বা কনডোলেন্স মশসন গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এবারে বিতর্ক দেখা দিয়েছে যে, কোন ব্যক্তিদের স্মরণ করা হচ্ছে তা নিয়ে। সমালোচকরা বলছেন, যেসব ব্যক্তি স্মরণ করা হয়েছে তারা মূলত সেই রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে যুক্ত, যাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বা তৎকালীন নেতৃত্বের স্মরণ করা হয়নি।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে বিএনপি এর, এবং সংসদ নেতা হিসেবে দেখা গেছে তারেক রহমানকে। বিরোধী দলের মধ্যে রয়েছে জামায়াত–এর মতো দল, যা ১৯৭১ সালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্কে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত।
বিগত সময়েও বিএনপি–জামায়াত জোট গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে। নতুন সংসদের প্রতীকী দৃশ্যপটে সেই রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আবারও জনমত সৃষ্টি হয়েছে।
সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় চরিত্র
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান নির্ধারণ করেছে চারটি মূলনীতি, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। পরবর্তীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হলেও পরবর্তীতে সংবিধানে পুনরায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
সংসদে ধর্মীয় প্রতীকীর দৃশ্যমান বৃদ্ধি নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, বাংলাদেশ কি তার মূল সাংবিধানিক ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক রাষ্ট্রীয় পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে?
সর্বশেষ মন্তব্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। তবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বহুত্ববাদী সমাজের ধারণা কি বজায় থাকবে তা এখন দেখার বিষয়।
জনমতের প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট, বেশিরভাগ মানুষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সংসদের এই অবস্থানকে সমালোচনা করছে। তারা মনে করছে, মুক্তিযুদ্ধকে উপেক্ষা করা এবং ধর্মীয় প্রতীকী মাত্রায় মনোনিবেশ করা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আদর্শ থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত।
ভবিষ্যৎ সংসদীয় সিদ্ধান্ত, আইন প্রণয়ন ও রাজনৈতিক অবস্থানই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ কি তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পথেই চলবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংকেতের দিকে এগোবে।
লেখক: শায়লা আহমেদ লোপা, ম্যানেজিং এডিটর । দ্যা ভয়েস

