মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার ভোররাতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক অভিযানের পরপরই তেহরান একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ও মিত্র ঘাঁটিগুলোর দিকে। বিভিন্ন দেশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আকাশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয় একাধিক রাষ্ট্রে।
ইসরায়েলের সেনাবাহিনী (Israel Defense Forces) এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানে একটি “বিস্তৃত ও যৌথ অভিযান” পরিচালনা করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান শুরু করেছে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো আমেরিকান জনগণকে রক্ষা করা এবং ইরানি শাসনের পক্ষ থেকে উদ্ভূত তাৎক্ষণিক হুমকি দূর করা।”
ইরানের পাল্টা আঘাত
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—প্রতিটি দেশ নিশ্চিত করেছে যে তারা ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এসব দেশেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, “আজ দেশটি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি স্পষ্ট হামলার শিকার হয়েছে। তবে আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেগুলো প্রতিহত করেছে।”
আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি ও দুবাইয়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে, “কাতারের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।”
বাহরাইনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সেবা কেন্দ্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে।

সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া
সৌদিরা সরাসরি হামলার শিকার না হলেও সৌদি আরব ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও কুয়েতের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে যে, প্রয়োজন হলে তারা এসব দেশের পাশে থাকবে এবং সম্ভাব্য পদক্ষেপে সহায়তা করবে।
আকাশপথ বন্ধ, ভ্রমণে বিপর্যয়
সংযুক্ত আরব আমিরাত সাময়িকভাবে আকাশপথ বন্ধ ঘোষণা করেছে “ব্যতিক্রমী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা” হিসেবে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে একাধিক ফ্লাইট ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এমিরেটস এয়ারলাইনস জানিয়েছে, “আঞ্চলিক আকাশপথ বন্ধের কারণে আমাদের একাধিক ফ্লাইটে বিঘ্ন ঘটেছে।”
শারজাহভিত্তিক এয়ার অ্যারাবিয়া জানিয়েছে, পরিস্থিতির কারণে ইরান, ইরাক ও অঞ্চলের অন্যান্য গন্তব্যে তাদের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
কাতার এয়ারওয়েজও নিশ্চিত করেছে যে, কাতারের আকাশপথ বন্ধ থাকায় দোহা থেকে আগমন-বহির্গমন ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ
মার্কিন দূতাবাসগুলো অঞ্চলজুড়ে তাদের কর্মী ও নাগরিকদের “শেল্টার-ইন-প্লেস”—অর্থাৎ ঘরের ভেতরে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার নির্দেশ দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা বৃদ্ধি, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে সংঘাত—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আগে থেকেই অস্থির ছিল। এবার সরাসরি সামরিক হামলা ও পাল্টা হামলা সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান আসছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক এই সংঘাত কেবল সামরিক নয়—অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন বিশ্বের নজরে।

