শেখ মুজিব – বাঙালির একমাত্র মহানায়ক

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা—একজন নেতার রাজনৈতিক যাত্রা ও আজকের প্রাসঙ্গিকতা

গত শতকের সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী সময়ে অনেক বাঙালি রাজনৈতিক নেতা শত বছর ধরে শোষিত বাঙালি ও ভারতবাসীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির জন্য নানা ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছিলেন। এদের মধ্যে রাসবিহারী বসু, শরৎ চন্দ্র বসু, সুভাষ চন্দ্র বসু (নেতাজি), এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাস্টারদা সূর্য সেনের নাম উল্লেখযোগ্য। সূর্য সেন ও সুভাষ বসুর চিন্তা ছিল, এক সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করা যাবে। তারা চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। হয়তো তাদের কৌশলে ভুল ছিল। জনগণকে তারা সাথে নিতে পারেননি। ইংরেজদের উপমহাদেশের জনগণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করার পরিকল্পনার কারণে তারা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হন। এরই মধ্যে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার নামে ভাগ হলো বাংলা আর পাঞ্জাব। এই ভাগের পেছনে ছিল ইংরেজদের দূরদৃষ্টিমূলক কূটকৌশল আর রাজনীতিবিদদের অপরিণামদর্শী চিন্তাধারা।

অবিভক্ত বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল গত শতকের ত্রিশের দশকে, সে আন্দোলনে একজন রাজপথের সৈনিক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন ১৯২০ সালে ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের তরুণ ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান। মা-বাবার আদরের নাম খোকা, যিনি আজ বিশ্বের বাঙালিদের কাছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হিসেবে পরিচিত।

এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এ বছর ১৭ মার্চ তাঁর জন্মের ১০৬ বছর পূর্তি হবে। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশে হবে না কোনো সভা-সমাবেশ, গণমাধ্যমে প্রচারিত হবে না কোনো অনুষ্ঠান। আর কেউ যদি এমন কিছু করার চেষ্টা করেন, তবে তাকে নির্ঘাত যেতে হবে কারাগারে। কারণ এই মুহূর্তে দেশে যে সরকার আছে, তারা বাংলা, বাঙালি আর বাংলাদেশের চিন্তাধারায় বিশ্বাস করেন না। তাদের মতে, শেখ মুজিব ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে তাদের প্রিয় পাকিস্তানের অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন। তারা প্রায় সকলেই নিজেদের ১৯৭১ সাল বা তার পূর্বের পাকিস্তানিদেরই ওয়ারিশ মনে করেন। বাংলাদেশের এই পাকিস্তান বানানোর কর্মসূচির সূচনা করা হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, যখন একটি দেশীয় ও বিদেশি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদনির্ভর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিদেশ থেকে ড. ইউনুসের মতো আরেকজন পাকিস্তানি চিন্তাধারার মানুষকে উড়িয়ে এনে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় বসানো হয়। পরবর্তী দেড় বছরে তিনি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেছেন।

বাল্যকাল থেকেই মুজিব যা কিছু সঠিক মনে করতেন, তার প্রতিবাদ করতেন। পড়ালেখার হাতেখড়ি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে। এই জেলায় মুসলিম, দলিত ও মতুয়া সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুরা সব সময় নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হতেন। দলিত ও মতুয়ারা তো সাধারণত স্কুলেই ভর্তি হতে পারতেন না। টুঙ্গিপাড়ার মতুয়াদের বিখ্যাত ধর্মগুরু হরিচাঁদ ঠাকুরও কোনো স্কুলে ভর্তি হতে না পেরে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন একটি মাদ্রাসায়।

স্কুলে ক্লাসের সামনের সিটে বসা ছিল মুসলমান আর নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জন্য নিষিদ্ধ। এই প্রথা ভেঙেছিলেন বালক শেখ মুজিব। স্কুলের প্রথম দিনেই তিনি গিয়ে বসেছিলেন সামনের বেঞ্চে। ক্লাসের অন্যান্য ছাত্ররা এতে কিছুটা শঙ্কিত হলেও শ্রেণির শিক্ষক গিরিশ বাবু ঘটনাটি এড়িয়ে যান, কারণ তিনি শেখ পরিবারের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

হাইস্কুল পাস করার পর শেখ মুজিবকে ১৯৪২ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) পড়ার জন্য পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর দিনগুলো তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠন করে। তিনি মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয় দলের রাজনীতিবিদদের সংস্পর্শে আসেন। সে সময় ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নেতাজি সুভাষ বসু এবং মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপকে তছনছ করে দিচ্ছিল। মুজিবের প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন নেতাজি, গান্ধী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎ চন্দ্র বসু এবং আবুল হাশিমের মতো রাজনীতিবিদদের দ্বারা প্রভাবিত হয়।

১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের ত্রুটিপূর্ণ নীতির কারণে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়। এই দুর্ভিক্ষের জন্য বিভিন্ন গবেষক ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে দায়ী করেন। স্কুলজীবন থেকেই মুজিব একজন ভালো সংগঠক ছিলেন এবং তিনি অবিলম্বে কলকাতা ও গোপালগঞ্জের ক্ষুধার্ত মানুষের সাহায্য করার জন্য ত্রাণ দল গঠন করেন।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে উপমহাদেশের ইতিহাসে ঘটে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র। এই বিভাজন এ অঞ্চলের শান্তি ও সম্প্রীতির উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। কোটি কোটি মানুষ হয়ে যায় উদ্বাস্তু।

১৯৪৮ সালে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন (পরে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়)। ছাত্রনেতা হিসেবে এটিই ছিল তাঁর রাজনীতিতে প্রথম বড় পদক্ষেপ। পরের বছর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরে আওয়ামী লীগ নামে পরিচিত হয়।

মুজিব জীবনের অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের মধ্যে ১৩ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন বাঙালিদের অধিকার রক্ষার জন্য। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা আওয়ামী লীগকে একাধিকবার নিষিদ্ধ করেছিল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং জনগণের কাছ থেকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি লাভ করেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, যার চূড়ান্ত বিজয় আসে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিব জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছর নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের ষড়যন্ত্রে তিনি সপরিবারে নিহত হন। তবুও ইতিহাসে তিনি চিরঅম্লান।

ইতিহাস মনে রাখে শুধু নায়কদের, ভুলে যায় খলনায়কদের। মার্কিন লেখক জোসেফ ক্যাম্পবেল লিখেছেন:
“একজন নায়ক হলেন সেই মানুষ, যিনি নিজের জীবনের চেয়ে বড় কোনো উদ্দেশ্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন।”

জাতির ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান বিচার করলে এর চেয়ে সত্য কথা আর কিছু হতে পারে না। তিনি হাজার বছর বেঁচে থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: সৈয়দ ইফতেখার আহমেদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
১৪ মার্চ ২০২৬

spot_img