বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শ্রদ্ধা: সংগ্রাম, কারাজীবন ও রাষ্ট্রগঠনের স্বপ্ন

বাঙালীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে বঙ্গবন্ধু জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন কারাগারে; স্বাধীনতার পর তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বাকশাল গঠন করে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও উন্নয়নের পথ দেখিয়েছেন।

কারাগারে কাটানো জীবন

বাঙালীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের বড় অংশ কারাগারে কাটিয়েছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন নীতি প্রতিটি পরিস্থিতিতেই তিনি ছিলেন অবিচল। জেলের অন্ধকার কক্ষে বসে তিনি লিখেছিলেন তাঁর অনুভূতি এবং দেশের জন্য দায়বদ্ধতার কথা।
জেলের ডায়েরি , কারাগারের রোজনামচা থেকে একটি বানী:
“মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে কারাগারের দেয়াল আটকে রাখতে পারে না। স্বাধীনতার জন্য লড়াই কখনো বৃথা যায় না।”

ছয় দফা ও আগরতলা মামলা

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা, যা পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা নির্ধারণ করেছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই দাবিকে দমন করতে চায় এবং ১৯৬৮ সালে তাঁকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা হয় বহুল আলোচিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।
কিন্তু মামলা উল্টো বাঙালির মধ্যে গণআন্দোলনের সঞ্চার করে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে পাকিস্তান সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং তখনই শেখ মুজিবুর রহমানকে দেওয়া হয় “বঙ্গবন্ধু” উপাধি।

১৯৭০ সালের নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা ও ষড়যন্ত্রের ফলে স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র হয়।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন, তা স্বাধীনতার আহ্বান।
শায়লা আহমেদ লোপা

২৫শে মার্চ কালরাত্রি পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু হয়। এই রাতে ঢাকা শহরে নিরপরাধ বাঙালি, ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের ওপর অতর্কিত হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি বাহিনী এই বর্বরতা চালায়। ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দমন অভিযান চালালে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তিনি কারাগারে বন্দি থাকেন, মৃত্যুদণ্ডের হুমকির মুখেও অবিচল থাকেন। তাঁর অনুপস্থিতিতেই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ডিসেম্বর ১৯৭১ এ স্বাধীনতা অর্জন

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠন (১৯৭২–১৯৭৫)

স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান দেশকে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়। সংবিধানের চারটি মূলনীতি .
জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ,নতুন বাংলাদেশের আদর্শিক ভিত্তি স্থাপন করে।
স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে শিল্প কারখানা পুনরুদ্ধার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের কাজও শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে।

বাকশাল ও প্রশাসনিক সংস্কার

১৯৭৫ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু  সাময়িক কালের জন‍্য গঠন করেন বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ)। এটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে দ্রুত পুনর্গঠন করার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো।
বাকশালের লক্ষ্য:
•রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা
•গ্রামীণ প্রশাসন শক্তিশালী করা
•কৃষক ও শ্রমিককে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনা
জেলা গভর্নর ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনে সমন্বয়, দুর্নীতি দমন এবং কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের কল্যাণ, বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন।
ইতিবাচক দিক
•যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করা
•প্রশাসন ও সরকারি কাজের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
•জনগণকে দেশের উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারে সরাসরি সংযুক্ত করা
বাকশাল ছিল বঙ্গবন্ধুর দূর্বল রাষ্ট্রকে দ্রুত পুনর্গঠনের প্রগতিশীল পদক্ষেপ, যেখানে প্রধান ফোকাস ছিল জনগণের কল্যাণ, প্রশাসনিক কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। নানা  বিতর্কে আবর্তিত বাকশাল,  মুলত  এটি ছিল একটি সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল কাঠামো।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫: একটি জাতির শোক

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে তাঁর ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে  হত্যা করা হয় । এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে হত্যা করা হয় একটি প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, ধনী-গরিব বৈষম্যহীন বাংলাদেশকে গড়ার স্বপ্ন। বিদেশে থাকায়  সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তাঁর দুই কন্যা, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

স্মরণ ও প্রেরণা

বঙ্গবন্ধুর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা, অধিকার এবং ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না। তাঁর সংগ্রাম, আদর্শ ও রাষ্ট্রগঠনের স্বপ্ন আজও বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা
spot_img