বাংলাদেশের ফুটবল অবকাঠামোর বড় অংশই গড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সরকারি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক ক্রীড়া স্থাপনা তৈরি ও সংস্কার করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়েই এবার সরকার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেডিয়াম বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ঢাকার কমলাপুর, সিলেট ও চট্টগ্রামের স্টেডিয়ামগুলো ফিফা-মানের ফুটবল ভেন্যুতে রূপ নেওয়ার সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার রাজধানীতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কার্যালয়ে বাফুফে আয়োজকদের সঙ্গে এক বৈঠকে এ ঘোষণা দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
“কমলাপুর, সিলেট ও চট্টগ্রাম—এই তিনটি স্টেডিয়াম চুক্তির ভিত্তিতে বাফুফেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে। খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলো হস্তান্তর করা হবে,” বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন প্রতিমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা অবকাঠামো
কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম নির্মিত হয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানে এবং ২০০১ সালে উদ্বোধন করা হয়। সে সময় বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা (১৯৯৬–২০০১)। ঢাকায় ফুটবল অবকাঠামো সম্প্রসারণের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করা হয়।
স্টেডিয়ামটির উন্নয়ন থেমে থাকেনি। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এটি ২০ বছরের জন্য বাফুফেকে লিজ দেওয়া হয়। পরে ২০২১ সালে একই সরকারের সময় ফিফার ‘ফরওয়ার্ড প্রজেক্ট’-এর অর্থায়নে স্টেডিয়ামটিতে কৃত্রিম টার্ফ বসানোসহ বড় ধরনের সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়।
সিলেট জেলা স্টেডিয়াম নির্মিত হয় ১৯৬৫ সালে এবং এটি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মালিকানাধীন। তবে ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ সামনে রেখে স্টেডিয়ামটির সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়।
চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৫ সালে। শেখ হাসিনার প্রথম সরকার (১৯৯৬–২০০১) আমলে এটি আধুনিকায়ন করা হয়, যার ফলে সে সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন সম্ভব হয়। বর্তমানে স্টেডিয়ামটি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মালিকানাধীন হলেও পরিচালনায় বাফুফের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

বাফুফের দীর্ঘদিনের দাবি
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন দীর্ঘদিন ধরেই নির্দিষ্ট ও স্থায়ী ফুটবল ভেন্যু বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছে। ফিফার উন্নয়ন তহবিল কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে মাঠের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে মনে করে ফেডারেশনটি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বৈঠকে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উত্থাপন করেন।
“ফিফা গ্রান্টের আওতায় মাঠ ব্যবহারের বিষয়টি বাফুফে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। আলোচনা শেষে তিনটি মাঠ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে,” বলেন তিনি।
নারী ও পুরুষ ফুটবলে প্রণোদনা
বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী দেশের নারী ফুটবল দলের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রশংসা করেন।
“নারী ফুটবলাররা যেভাবে নিয়মিত ভালো পারফরম্যান্স করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়,” বলেন তিনি।
তিনি জানান, নারী ফুটবলারদের বিদ্যমান মাসিক ভাতার পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে জাতীয় পুরুষ ফুটবল দলকেও চুক্তিভিত্তিক, টেকসই বেতন কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃণমূল ফুটবলে গুরুত্ব
প্রতিমন্ত্রী বাফুফেকে অনূর্ধ্ব-বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টের ক্যালেন্ডার প্রণয়ন এবং জেলা পর্যায়ে নিয়মিত লিগ চালুর আহ্বান জানান। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা না থাকায় প্রতিভা খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অর্থায়নে বেসরকারি খাত
এদিকে, ক্রীড়া উন্নয়নে অর্থায়ন বাড়াতে প্রতিমন্ত্রী ৪১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানান। এই বৈঠকে ক্রীড়া খাতে বেসরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। স্টেডিয়াম হস্তান্তর, খেলোয়াড়দের বেতন কাঠামো এবং তৃণমূল ফুটবলে জোর দেওয়া—এই তিনটি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

