ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছেন গ্রামবাসীরা। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকালে নবীনগর উপজেলার পশ্চিম ইউনিয়নের চর লাপাং এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন।
আহতরা হলেন—নুরুল আমিন (৪২), রউফ মিয়া (৪৫), সফর মিয়া (৫০), সিয়াম হোসেন (১৬), জসিম উদ্দিন (৪০) ও ইব্রাহিম (৩০)। প্রথমে তাদের নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, সবাই শরীরে ছররা গুলিতে আহত হয়েছেন। তবে কারও অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানেও থামেনি উত্তোলন
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেঘনা নদীর চর লাপাং সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র ৫০টিরও বেশি ড্রেজার ও এক্সকাভেটর ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। এর ফলে নদীর তীর ভাঙন বেড়েছে, ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে।
গ্রামবাসীরা জানান, এর আগে প্রশাসন কয়েক দফা অভিযান চালালেও কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও উত্তোলন শুরু হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রোববার সকালে এলাকাবাসী নদীতীরে জড়ো হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
স্পিডবোটে এসে হামলা
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সকাল বেলায় ২০ থেকে ৩০ জনের একটি সশস্ত্র দল স্পিডবোটে করে এসে প্রতিবাদকারীদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় ছররা গুলি ছোড়া হয়। হঠাৎ হামলায় ছয়জন গুলিবিদ্ধ হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন।
খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পিয়াস বসাক ও নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলামর নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছান। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। হামলাকারীরা পালিয়ে গেছে।
‘কোনো বৈধ লিজ নেই’
নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রোববার সাংবাদিকদের বলেন, “চর লাপাং এলাকায় কোনো বৈধ বালু লিজ নেই। যে উত্তোলন চলছে তা সম্পূর্ণ অবৈধ।” তিনি আরও জানান, অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে এবং প্রয়োজনে পাশের জেলা নরসিংদীর প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথ অভিযান চালানো হবে।
তার ভাষায়, “আমরা প্রমাণের ভিত্তিতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
এমপির কঠোর বার্তা
এ ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য এম এ মান্নান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে গিয়ে গ্রামবাসীর ওপর হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “নদী ও কৃষিজমি রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। কোনো সন্ত্রাসী তৎপরতা বরদাশত করা হবে না।”
পরিবেশ ও জীবিকার হুমকি
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, নিয়ন্ত্রণহীন বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে দেয়, তীরভাঙন বাড়ায় এবং কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে। বাংলাদেশে নির্মাণ খাতে বালুর চাহিদা বেশি হওয়ায় অবৈধ উত্তোলনের ঝুঁকিও বেড়েছে।
নদীভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এ ধরনের কার্যক্রম মারাত্মক হুমকি। চর লাপাংয়ের বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে তাদের বসতভিটা ও আবাদি জমি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে।
আতঙ্কে এলাকাবাসী
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। আহতদের স্বজনরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রশাসনের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বড় আকারে অবৈধ উত্তোলন চলছে এবং প্রতিবাদ করলেই কেন গুলির মুখে পড়তে হচ্ছে।
প্রশাসন বলছে, দোষীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে গ্রামবাসীরা চান—শুধু গ্রেপ্তার নয়, অবৈধ বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ।
চর লাপাংয়ের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে সংঘাত কেবল পরিবেশের নয়—মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। নদী রক্ষা, আইনের শাসন এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

