বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে ভোটের চেয়ে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্তই বেশি আলোচনায় এসেছে। দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় এবং দলটির ডাকে ব্যাপক ভোটবর্জনের মধ্য দিয়ে গতকাল (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন কার্যত একতরফা রূপ নেয়।
এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি পেয়েছে ২০৯টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা ছিল সীমিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি দলীয় বিজয় নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
এই নির্বাচনটি ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে সংঘটিত সহিংস রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই সময় সহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগ
সরকারপন্থী কিছু গণমাধ্যম নির্বাচনকে “বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ” বললেও স্থানীয় ও বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতায় ভোটের দিন অন্তত সাত জেলায় প্রাণহানির খবর আসে। প্রায় ৯ লাখ নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন সত্ত্বেও সহিংসতা ঠেকানো যায়নি।
নির্বাচনের আগে পুলিশি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে কয়েক সপ্তাহে ৩১৭টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ জানায়, প্রাক-নির্বাচনী সহিংসতায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একাধিক এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যালট প্রাক-সিল মারা, ভোট কেনাবেচা, অস্ত্র মজুদের অভিযোগ ওঠে। কুমিল্লায় একটি অভিযানে দেশীয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ উদ্ধারের দাবি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ভোটের বদলে বর্জনের আওয়াজ
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসে, ততই স্পষ্ট হতে থাকে ভোটের প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে যেখানে সাধারণত নির্বাচনী সভা, মিছিল ও প্রচারণার দৃশ্য দেখা যায়, সেখানে ছিল অস্বাভাবিক নীরবতা। এর বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রবাসী কমিউনিটি এমনকি কারাগারের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে একটি স্লোগান—“নৌকা নেই, ভোট নেই।”
আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের কাছে এই বর্জন ছিল কেবল ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; বরং তারা একে দেখেছেন রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় প্রকাশ্যে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার। তাঁদের বক্তব্যে নির্বাচনকে “সাজানো” ও “অবৈধ” আখ্যা দিয়ে ভোটে অংশ না নেওয়াকে গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কারাগারেও ভোটবর্জন
নির্বাচনের আগে কিছু গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা কারাগার থেকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন। যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়, তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
এই দাবিগুলো দ্রুতই বিতর্কের মুখে পড়ে। কারাগার থেকে একটি হাতে লেখা চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা জুনাইদ আহমেদ পলকের নামে প্রচারিত হয়। ওই চিঠিতে নির্বাচন ও অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা সরাসরি অস্বীকার করা হয়। চিঠিতে লেখা হয়,
“জেলে অনাহারে মারা গেলেও আমি এই অবৈধ নির্বাচনে ভোট দেব না।”
চিঠিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের কথা উল্লেখ করে ভোটবর্জনকে প্রতিরোধের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এরপর শনিবার সন্ধ্যায় কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল-ফারহাদ একটি স্থানীয় দৈনিককে বলেন,
“সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, জুনাইদ আহমেদসহ কোনো ভিআইপি বন্দি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন—এমন খবর সঠিক নয়। তারা পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধনও করেননি।”
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৮৫ হাজার বন্দির মধ্যে মাত্র ৫ হাজার ৯৪০ জন পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেন এবং শেষ পর্যন্ত ভোট দেন ৪ হাজার ৫৩৮ জন। অর্থাৎ প্রায় ৯৩ শতাংশ বন্দি ভোটে অংশ নেননি।
আইনজীবীরা বলছেন, এর পেছনে রাজনৈতিক কারণই মুখ্য। আওয়ামী লীগপন্থী একাধিক বন্দির আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি বলেন,
“যে দলে তারা বিশ্বাস করে, সেই দলই যদি নির্বাচনে না থাকে, তাহলে তারা ভোট দেবে কাকে? এই প্রশ্নটাই তারা করছে।”
প্রবাসীদের মাঝেও অনাগ্রহ
ভোটবর্জনের চিত্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও স্পষ্ট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত এক কোটির বেশি বাংলাদেশির মধ্যে মাত্র সাড়ে সাত লাখের মতো পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেন। তাদের মধ্যেও প্রায় আড়াই লাখ ভোট দেননি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে নারী ভোটারের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৬ শতাংশ।
এর পাশাপাশি ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠে। প্রায় ১২ হাজারের বেশি ব্যালট সময়মতো দেশে না ফেরায় নির্বাচন কমিশনের কয়েক মিলিয়ন টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়।
বিতর্কিত বাস্তবতায় নতুন সংসদ
নির্বাচন কমিশন ভোটার উপস্থিতি ৬০ দশমিক ৬৯ শতাংশ বলে ঘোষণা করলেও, কেন্দ্রভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশ না করায় এই পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংসদ গঠিত হলেও, রাজনৈতিক বিতর্ক এখানেই শেষ হয়নি। বরং প্রশ্ন উঠেছে—আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচন কতটা নৈতিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।
অনেকের কাছে এই নির্বাচন ছিল ক্ষমতা নির্ধারণের লড়াই নয়; বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক আত্মপরিচয় নিয়ে একটি গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মুহূর্ত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সার্বভৌমত্বের ধারণার সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় মিলিয়ে দেখা মানুষের কাছে ভোটবর্জন তাই নিছক অনুপস্থিতি নয়—এটি ছিল একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।

