ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে এলেও দেশের কোথাও তেমন ভোটের আমেজ চোখে পড়ছে না। শহর থেকে গ্রাম, এমনকি কারাগার পর্যন্ত—সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে একটি স্লোগান: ‘নো বোট, নো ভোট’, ‘নৌকা নাই, ভোট নাই।’ নির্বাচন ঘিরে যেখানে প্রচার, জনসভা আর ভোটার তৎপরতা থাকার কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে নিরুত্তাপ পরিবেশ ও ব্যাপক অনাগ্রহ।
নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর রাস্তায় নেই স্বাভাবিক নির্বাচনী চাঞ্চল্য। এর বিপরীতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে একতরফা নির্বাচন আয়োজন, জনআস্থা ক্ষুণ্ন করা এবং সরকারঘেঁষা গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রপাগান্ডা চালানোর অভিযোগ জোরালো হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয় কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে, যেখানে দাবি করা হয়—কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। যাদের নাম উল্লেখ করা হয়, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
তবে এই দাবি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙে পড়ে। কারাগার থেকে লেখা একটি চিরকূট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা সাবেক প্রতিমন্ত্রী পলকের বলে দাবি করা হয়। ওই লেখায় তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তিনি বা অন্য কেউ ভোট দেননি এবং এই নির্বাচনকে অবৈধ বলে আখ্যা দেন। চিরকূটে তিনি লেখেন,
“জেলখানায় না খেয়ে মরলেও ভোট দেব না।”
এতে তিনি সবাইকে ভোট বর্জনের আহ্বান জানান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের কথা উল্লেখ করে ভোটবর্জনকে প্রতিরোধের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
কারা কর্তৃপক্ষও দ্রুত এসব খবর নাকচ করে দেয়। শনিবার সন্ধ্যায় কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) মো. জান্নাত-উল-ফরহাদ ভয়েসকে বলেন, “সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, জুনাইদ আহমেদসহ ভিআইপি বন্দিরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন বা নিবন্ধন করেছেন—এ ধরনের খবর সত্য নয়। এমন তথ্য আমরা দিইনি। তারা কেউই নিবন্ধন করেননি।”
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্দিদের মধ্যে ভোটগ্রহণের সাড়া ছিল অত্যন্ত কম। সারা দেশের প্রায় ৮৫ হাজার বন্দির মধ্যে মাত্র ৫ হাজার ৯৪০ জন ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪ হাজার ৫৩৮ জন। অর্থাৎ প্রায় ৯৩ শতাংশ বন্দি ভোট দিতে আগ্রহ দেখাননি। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ ভোটগ্রহণ ৭ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়, পরে এক দিনের জন্য সময় বাড়ানো হয়।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, অনেক বন্দির কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকা এবং কারাগারে নিবন্ধন করলে জামিনে বেরিয়ে ভোট দিতে না পারার আশঙ্কা—এই দুই কারণে অনেকে নিবন্ধন করেননি। তবে বন্দিদের আইনজীবীরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন।
আওয়ামী লীগপন্থি বেশ কয়েকজন বন্দির আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী কালবেলাকে বলেন,
“যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই, সেখানে মানুষের আগ্রহ কীভাবে থাকবে? কারাগারে অনেক আসামিই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। তারা কাকে ভোট দেবে—এই প্রশ্নটাই বড়।”
কারাগারের বাইরে পরিস্থিতি খুব একটা ভিন্ন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা এক কোটির বেশি প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করেন মাত্র ৭ লাখ ৬৭ হাজার ১৮৮ জন। তাদের মধ্যেও প্রায় আড়াই লাখ শেষ পর্যন্ত ভোট দেননি। সরকারি হিসাবেই স্বীকার করা হয়েছে, প্রবাসী নারীদের ভোটদানের হার মাত্র ৬ শতাংশ।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা। যথাসময়ে ব্যালট পৌঁছাতে না পারায় ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২ হাজার ১৭০টি ব্যালট দেশে ফেরত আসে। এতে ব্যালটপ্রতি গড়ে ৭০০ টাকা হিসাবে নির্বাচন কমিশনের ক্ষতি হয়েছে ৮৫ লাখ টাকারও বেশি।
এই পরিসংখ্যানগুলো নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। কমিশন সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করলেও সমালোচকদের মতে, এই কম ভোটার উপস্থিতি কোনো উদাসীনতা নয়—এটি একটি সচেতন প্রত্যাখ্যান।

এদিকে, ঠাকুরগাঁওয়ে সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনের কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শোক জানাতে যাওয়াকে অনেকেই লোকদেখানো বলে সমালোচনা করেছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অভিযোগ, মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি করে মৃত্যুর পর সহানুভূতির নাটক ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। একইভাবে জামায়াত প্রার্থীদের আচরণও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
গত দেড় বছরে গণগ্রেপ্তার, সহিংসতা, লুটপাট এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলার স্মৃতি এখনো তাজা। বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ এসব অভিযানে নিজেদের ভূমিকার কথা প্রকাশ্যেই স্বীকার করায় নির্বাচন নিয়ে ভয়ের পরিবেশ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে তথাকথিত “ইতিহাসসেরা নির্বাচন” আয়োজনের যে ধারণা অন্তর্বর্তী সরকার তুলে ধরছে, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্নের মুখে। পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে বাদ দিয়ে করা কোনো নির্বাচন দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্যতা পায় না।
এমন বাস্তবতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় প্রকাশ্যে এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে ভোট না দেওয়াকে গণতন্ত্র রক্ষার অংশ হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার প্রশ্ন নয়—এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতা ও নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সে কারণেই দেশের ভেতরে ও বাইরে বহু মানুষ ভোট বর্জনকে নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখছেন।

