কারাবন্দি অবস্থায় মারা গেলেন আওয়ামী লীগ নেতা রমেশ চন্দ্র সেন

কারাবন্দি অবস্থায় সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু মানবাধিকার ও কারা চিকিৎসা ব্যবস্থার গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

কারাবন্দি অবস্থায় মারা গেছেন সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা রমেশ চন্দ্র সেন। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক তৌফিক হাসান জানান, তাঁকে মৃত অবস্থাতেই হাসপাতালে আনা হয়েছিল।

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার মাসুদ রানা বলেন, শনিবার সকালে রমেশ চন্দ্র সেনকে হাসপাতালে আনা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক অনুপম পাল সকাল ৯টা ২৯ মিনিটে ঘোষণা করেন, তাঁকে মৃত অবস্থায় আনা হাসপাতালে হয়েছে।

৮৬ বছর বয়সী রমেশ চন্দ্র সেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরের সময়ে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দিনাজপুর জেলা কারাগারে বন্দি ছিলেন। সাবেক একজন শিক্ষক, একজন মন্ত্রী এবং পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য—এমন একজন প্রবীণ রাজনীতিককে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে দুই হাতে মোটা দড়ি বেঁধে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা হয়েছিল। পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ, কার্যত কোনো চিকিৎসা না পেয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

দিনাজপুর জেলা কারাগারের জেল সুপার ফরহাদ সরকার সাংবাদিকদের জানান, রমেশ চন্দ্র সেন ডিভিশনপ্রাপ্ত কয়েদি ছিলেন এবং আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। শনিবার সকাল ৯টার দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দ্রুত দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখানেই তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তিনি জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। মামলার বরাতে পুলিশ জানায়, তাঁকে হত্যাসহ তিনটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে প্রথমে ঠাকুরগাঁও জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। পরদিন ১৭ আগস্ট তাঁকে দিনাজপুর জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। পরে বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলায় আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অভিযোগ রয়েছে, কোনো অপরাধ প্রমাণিত না হলেও দেড় বছর ধরে এই প্রবীণ রাজনীতিককে জামিন না দিয়ে কারাগারে আটকে রাখা হয়।

রমেশ চন্দ্র সেনের পরিবার ও দলীয় নেতারা বলছেন, গ্রেপ্তারের সময় তিনি পালিয়ে যাননি; নিজ বাড়িতেই ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। তবুও তাঁকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ কারাবাসে তাঁর শারীরিক অবস্থা মারাত্মকভাবে অবনতির দিকে গেলেও যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি।

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসার অভাব নতুন নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ১০৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যাদের অনেকেই যথাযথ চিকিৎসা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

রমেশ চন্দ্র সেনের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের ওপরও নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ইসলামপন্থীদের সমর্থনে সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দিনাজপুরে তাঁর শহরের বাড়ি ও গ্রামের বাড়িতে একাধিকবার লুটপাট চালানো হয় এবং দুই বাড়িতেই আগুন দেওয়া হয়। পরিবার জানায়, কোনো অপরাধ না করেও তাঁরা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হন।

রমেশ চন্দ্র সেন ১৯৪০ সালের ৩০ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নের কশালগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ক্ষিতীন্দ্র মোহন সেন এবং মাতার নাম বালাশ্বরী সেন। তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৭ সালে উপনির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ছিলেন।

একজন প্রবীণ রাজনীতিকের কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যু দেশজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বিচার, মানবাধিকার এবং কারা ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা নিয়ে। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার শিকার হয়ে একজন আজীবন রাজনীতিতে যুক্ত মানুষ শেষ পর্যন্ত জীবন হারালেন, যা রাষ্ট্রের জন্য গভীর আত্মসমালোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

spot_img