আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অস্থিতিশীলতা বাড়াবে: হাছান মাহমুদ

হাসান মাহমুদ এবং মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সতর্ক করেছেন যে, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন বাংলাদেশের অস্থিরতা আরও বাড়াবে এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণ করবে।

নয়াদিল্লি, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ — বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনে বাদ দিলে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা আসবে না। তিনি বলেন, যে দল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং বহুবার দেশের শাসন করেছে, সেই দলটিকে বাদ দেওয়া নির্বাচনকে একটি “প্রহসন” বানিয়ে ফেলবে। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠবে।

গতকাল ভারতের নয়াদিল্লিতে প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (আইসিআরএফ)’ আয়োজিত মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে তাঁর সাথে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও সাংবাদিকদের মুখোমুখী হন। তাঁরা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া নির্বাচনে স্থিতিশীলতা আনবে না

হাছান মাহমুদ বলেন, “১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজিত করা মানে দেশের জনগণের ভোটাধিকারের প্রতি অবমাননা। আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন একটি সুপরিকল্পিত প্রহসন ছাড়া আর কিছুই হবে না। এটি দেশে স্থিতিশীলতা আনবে না, বরং অস্থিরতা আরও বাড়াবে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। আমি সন্দেহ প্রকাশ করছি যে, নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন হবে, তা আসলেই হবে কিনা। আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই, তবে বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।”

অন্তর্বর্তী সরকারের অক্ষমতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন

হাছান মাহমুদ এবং মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, দুই নেতা একযোগে অভিযোগ করেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সম্পূর্ণভাবে অক্ষম। তাঁরা দাবি করেন, সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সরকারের অধীনে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর আক্রমণ, হত্যা এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

“আমরা এক আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু করেছি, যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা যায়। গত ১৬ মাসে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে, তা দেশের জন্য একটি কালো অধ্যায়,” মাহমুদ বলেন।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক

হাসান মাহমুদ তার বক্তৃতায় ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনগণের প্রতি যে সমর্থন প্রদান করেছিল, তা আজও অব্যাহত রয়েছে।

“১৯৭১ সালে যখন ভারত আমাদের সাহায্য করেছিল, তখন তারা আমাদের সীমান্ত খুলে দিয়েছিল, আর তাদের জনগণ আমাদের জন্য হৃদয় খুলে দিয়েছিল। শেখ হাসিনা যখন সম্প্রতি ভারতে সফর করেছিলেন, তখন তাকে পূর্ণ প্রোটোকল দেওয়া হয়েছিল। এটি ভারতের প্রতি আমাদের সম্পর্কের শক্তিশালী প্রতিফলন,” মাহমুদ উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে তা ভিত্তিহীন। মাহমুদ জানান, ভারত সব সময় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার রিপোর্টে আওয়ামী লীগের আপত্তি

মাহমুদ, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের (OHCHR) রিপোর্টের সমালোচনা করেন, যা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছে। মাহমুদ বলেন, রিপোর্টটি পক্ষপাতদুষ্ট এবং অচল তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের উপেক্ষা করা হয়েছে।

“জাতিসংঘের রিপোর্টে যে তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তা অসঙ্গতিপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ নয়। এতে আমাদের দলের নেতাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়নি। এছাড়া পুলিশ কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যও উপেক্ষা করা হয়েছে,” মাহমুদ অভিযোগ করেন।

তিনি দাবি করেন, জাতিসংঘের রিপোর্টে পুলিশ সদস্যদের হত্যার ঘটনা এবং তাদের ওপর আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হয়নি, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। এছাড়া, রক্তপাতের প্রকৃত কারণ এবং হত্যাকাণ্ডের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি।

আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান

হাসান মাহমুদ বলেন, আওয়ামী লীগ দেশে ফিরে ক্ষমতায় আসবে এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনবে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

“আমরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসব। আমরা জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করব। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র চায় এবং আমরা তাদের সেই অধিকার ফিরিয়ে দেব,” মাহমুদ দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।

আইসিআরএফ-এ প্রতিবাদ এবং বৈঠক

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে, এবং উগ্রপন্থী উপাদানগুলো দেশে বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে।

এছাড়া, আইসিআরএফ-এর মুখপাত্র গোলাম মারুফ মজুমদার নিঝুমও এই বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার রিপোর্টের প্রতি আইসিআরএফ-এর স্বাধীন আইনি প্রতিবাদ তুলে ধরেন।

বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নির্বাচন

নয়াদিল্লির এই বৈঠকটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আহরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ দলের নেতারা বলেন, তারা নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তারা আশা করছেন, আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট চলমান এবং আওয়ামী লীগ দৃঢ়ভাবে দাবি করছে যে, তারা পুনরায় ক্ষমতায় ফিরবে। বর্তমান অবস্থা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে, এবং আওয়ামী লীগ মনে করে যে, তাদের বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশের মানুষের জন্য ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

spot_img