শেখ হাসিনার ডাক: “নো বোট, নো ভোট”

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দলটির সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত দুই মাস ধরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁর দল নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। তবে সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিল দলটি।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বদানকারী এই রাজনৈতিক দলকে। আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র পরিচালনাও করেছে দলটি। বিপুল জনসমর্থনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে ইউনূসের সেনা-সমর্থিত সরকার। নির্বাচন কমিশন তাদের দলীয় নিবন্ধনও স্থগিত করেছে।

এমন অবস্থায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে কমিশন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ১৪টি দলকে একইভাবে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। এমনকি ৯ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করা বৃহৎ রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টিকেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে এর পরিণতি কী হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনার বয়কট আহ্বানের পর নৌকা প্রতীকের প্রায় ৪০ শতাংশ সমর্থকের পাশাপাশি প্রায় ২০ শতাংশ ফ্লোটিং ভোটারও ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। এতে নির্ধারিত দিনে আদৌ ভোট হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গতকাল এক ভিডিও বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, “যে ব্যালটে নৌকা প্রতীক থাকবে না, যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারবে না, সেখানে আমাদের সমর্থক, কোনও ভোটার, নৌকার ভোটাররা কেউ ভোটকেন্দ্রে যাবে না। ভয়-ভীতি, হত্যা, সন্ত্রাস, গ্রেফতার, হুমকি, অত্যাচার, দমন-পীড়ন, গুম, খুন, অপহরণ, নিষ্ঠুর মবসন্ত্রাস—যাই করুক না কেন, তারা ভোট দিতে যাবে না। গণতন্ত্রপ্রিয় দেশবাসীর কাছে এই বার্তাটি পৌঁছে দিন।”

নতুন ভার্চুয়াল বক্তৃতায় যা বললেন শেখ হাসিনা | পলাতক হাসিনার নতুন অডিও রেকর্ড | Sheikh Hasina Audio

১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানিয়ে দেড় পাতার একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। বিবৃতির শুরুতেই শেখ হাসিনার আহ্বান তুলে ধরা হয়—“ফ্যাসিস্ট ইউনূস জঙ্গি পাহারায় ভোট করাতে চায়। সেই ভোট দিতে যাবেন না। যে ব্যালটে নৌকা প্রতীক থাকবে না, যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারবে না, সেখানে আমাদের সমর্থক কোনও ভোটার কেউ ভোটকেন্দ্রে যাবেন না।” একই বার্তায় তিনি আবারও বলেন, ভয়-ভীতি, গ্রেফতার, দমন-পীড়ন বা মবসন্ত্রাস যাই হোক না কেন, ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকতে।

প্রসঙ্গত, প্রায় তিন মাস আগে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ভোট বয়কটের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের নির্বাচনী বৈধতা থাকা জরুরি। লক্ষ লক্ষ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা ভোট দেবেন না। তাঁর ভাষায়, একটি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।

বিবৃতিতে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে দেশকে গভীর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে ফেলা হয়েছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন অনুপস্থিত। নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে, শিল্পাঙ্গনে অরাজকতা তৈরি হয়েছে এবং দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে—এমন অভিযোগও করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ বেশ কিছু দাবি তোলে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে বর্তমান ক্ষমতাধরদের পদত্যাগ ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর; শেখ হাসিনাসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা ও রায় বাতিল; আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আটক ব্যক্তিদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার; বাংলাদেশ ছাত্রলীগসহ স্বাধীনতার পক্ষে থাকা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

এছাড়া ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওপর চলমান সহিংসতা, দখল, লুণ্ঠন ও নির্যাতন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানানো হয়।

আওয়ামী লীগের বক্তব্য, দলটি ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোট অধিকাংশ ভোটারের সমর্থনপুষ্ট। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না এবং দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতাও পাবে না। তাই আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে।

শেষে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে দলটি বলে, দেশের এই সংকটকালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে স্বাধীনতার পক্ষের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিনে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটও হবে। মনোনয়ন জমা নেওয়া হয়েছে ১২ থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। মনোনয়ন যাচাই হয়েছে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। বাতিল হওয়া মনোনয়নের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল যাচাই চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ও প্রতীক বরাদ্দ হবে ২১ জানুয়ারি। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি এবং চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত।

spot_img