ঢাকায় গণপিটুনিতে আরও এক প্রাণহানি, মব সংস্কৃতির উদ্বেগ যাচ্ছে না

দেশজুড়ে গণপিটুনি ও হামলার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে, বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার কথা বলছেন আইনজ্ঞরা

ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি — রাজধানীতে গণপিটুনির ঘটনায় আবারও একটি প্রাণ ঝরে গেছে। চুরির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এক ৩৫ বছর বয়সী ব্যক্তিকে। রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে ঢাকার একটি কবরস্থানের কাছে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এই ঘটনা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তবর্তী সরকারের আমলে চালু হওয়া দেশজুড়ে মব হামলা বা গণপিটুনি প্রবণতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং গত দেড় বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ওঠা একটি ভয়াবহ সামাজিক সংকটের অংশ।

পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক চিত্র

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আস্ক)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ১৯৭ জন মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এই সহিংসতা।

অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশে ২৫৯ জন গণপিটুনিতে নিহত এবং অন্তত ৩১৩ জন আহত হয়েছেন।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় অনেক ঘটনা গণমাধ্যম বা প্রশাসনের নজরে আসে না।

‘এটি বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা’

এই পরিস্থিতিকে সরাসরি বিচারব্যবস্থার সংকট হিসেবে দেখছেন আইনজ্ঞরা। ঢাকায় ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্য ভয়েসকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট পারভেজ হাসেম বলেন, “গণপিটুনি কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের প্রকাশ নয়। এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।”

তিনি বলেন, “যখন মানুষ মনে করে পুলিশ বা আদালত সময়মতো ন্যায়বিচার দিতে পারবে না, তখন তারা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিতে চায়। এতে নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে।”

গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা

আইনজীবী সাঈদ আহমেদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়াও গণপিটুনির বড় কারণ।
“চুরি, শিশু অপহরণ, নারী নির্যাতন বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত—এ ধরনের অভিযোগ মুহূর্তেই উত্তেজনা ছড়ায়। যাচাই না করেই মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, আর সেই ক্ষোভ প্রাণঘাতী রূপ নেয়,” বলেন তিনি।

মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারবহির্ভূত এই সহিংসতা সংবিধান, আইন ও মৌলিক মানবাধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। একই সঙ্গে এটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে।

ঢাকায় ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্য ভয়েসকে দেওয়া এক বক্তব্যে মানবাধিকার আইনজীবী ব্যারিস্টার ফারান এমডি আরাফ বলেন, “গণপিটুনি শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে না, এটি সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং দোষীদের জবাবদিহি অপরিহার্য।”

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া

দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আইনশৃঙ্খলার এই অবনতিকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। তারা বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি ঢাকায় এক বক্তব্যে বলেন,
“মব কালচার আর বরদাশত করা হবে না।”

তিনি আরও বলেন, “দাবি আদায়ের নামে রাস্তা অবরোধ বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়। আইনি পথেই সব দাবি জানাতে হবে—স্মারকলিপি, সভা-সমাবেশ বা আদালতের মাধ্যমে।”

আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বক্তব্য বা হুঁশিয়ারি যথেষ্ট নয়। দৃশ্যমান বিচার ও দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই সহিংসতা থামবে না। রাজধানী থেকে গ্রাম—সবখানেই এখন অভিযোগ উঠলেই প্রাণ হারানোর ভয় কাজ করছে।

২৩ ফেব্রুয়ারির এই হত্যাকাণ্ড আবারও প্রমাণ করল, গণপিটুনি কোনো সমাধান নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ন্যায়বিচার যদি আদালতে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে ক্ষুব্ধ জনতার হাতে আইন চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

spot_img