আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাঁদাবাজি বেড়েছে ৫০ শতাংশ: ডিসিসিআই

ব্যবসায়ীদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতি কমেনি; বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে

ঢাকা, মতিঝিল — ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে চাঁদাবাজি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে বলে দাবি করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির দাবি, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি চাঁদা দিতে হচ্ছে, আর অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়েই সরকারি দপ্তরগুলোতে দুর্নীতি অব্যাহত ছিল।

মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই মিলনায়তনে ‘বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ডিসিসিআই সভাপতি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর সভাপতি তাসকিন আহমেদ।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগেও চাঁদা দিতে হতো, এখনো ব্যবসায়ীদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চাঁদার পরিমাণ আরও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আমাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।”

কারা চাঁদা দাবি করছে

চাঁদাবাজির জন্য কারা দায়ী—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করেই মূলত এই চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

“যারা টাকা নিতে আসে, তারা বলে—আমরা সরকার দল থেকে এসেছি। সরকার যেই থাকুক না কেন, তারা বলে তারা ক্ষমতাসীন দলের লোক। অনুষ্ঠান, মহল্লার কাজ, নানা অজুহাতে টাকা দাবি করা হয়,” বলেন তাসকিন আহমেদ।

তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ও রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নামও উঠে আসছে। এমনকি কারখানা, অফিসে ঢুকতে কিংবা রাস্তায় চলাচলের সময়ও টাকা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিকে একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এটা যেন আমাদের রক্তের ভেতরে ঢুকে গেছে। যদি এটা বন্ধ না হয়, তাহলে ব্যবসা গুটিয়ে দেশ ছাড়া হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।”

দুর্নীতি একদিনও কমেনি

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সময়কাল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তাঁর ভাষায়,
“অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি অফিসগুলোতে একদিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি।”

ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়বে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি। বরং অনিশ্চয়তা, দালালচক্র ও অবৈধ লেনদেন আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

অর্থনীতি চাপে, বিনিয়োগে ভাটা

সংবাদ সম্মেলনে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্রও তুলে ধরেন ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, নতুন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন অর্থনীতি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা ও চাপের মধ্যে রয়েছে।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—

  • ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.৪৯ শতাংশে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
  • ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৬.১০ শতাংশে দাঁড়ায়।
  • বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২.৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
  • একই সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।

তাসকিন আহমেদ বলেন,
“ব্যাংকিং খাতে চাপ, আমদানির খরচ বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি—সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

ঋণখেলাপি ও উচ্চ সুদের চাপ

ব্যাংক খাত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডিসিসিআই সভাপতি জানান, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে তিনি বলেন, সব খেলাপি ঋণই ইচ্ছাকৃত নয়।

“করোনা, বৈশ্বিক যুদ্ধ, দুই বছরে প্রায় ৪১ শতাংশ টাকার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ সুদের কারণে বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা কার্যকর মূলধনের সংকটে পড়ে খেলাপি হয়ে গেছে,” বলেন তিনি।

তিনি ইচ্ছাকৃত বড় ঋণখেলাপি ও বাস্তব সংকটে পড়া ব্যবসায়ীদের আলাদা করার আহ্বান জানান এবং কার্যকর ব্যবসাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তার দাবি জানান।

মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশে রাখার ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে ১৬ শতাংশের ওপরে চলে গেছে।

“এতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া ব্যবসার জন্য অযোগ্য হয়ে পড়েছে,” বলেন তাসকিন আহমেদ।

গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ ব্যয়

ডিসিসিআই সভাপতি জানান, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাস ঘাটতি রয়েছে, যা শিল্প উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৪০ টাকা এবং ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ৪২ টাকা।

তিনি বলেন,
“দেশে ২৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন অনেক কম। অথচ উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।”

তিনি আধুনিক ও সমন্বিত জ্বালানি নীতির দাবি জানান এবং উল্লেখ করেন, সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে।

করনীতি ও বন্দর নিয়ে অভিযোগ

করনীতির বিষয়ে তিনি জিডিপির ৮ শতাংশে কর আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনাকে স্বাগত জানালেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পূর্ণ অটোমেশন জরুরি বলে মন্তব্য করেন।

“এখনো কর ব্যবস্থার বড় অংশ ম্যানুয়াল। এতে দুর্নীতি ও অদক্ষতা বাড়ে,” বলেন তিনি।

তিনি টার্নওভার কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৬ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন।

এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের গড়ে ৪১ শতাংশ শুল্ক বাড়ানো নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। দেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ বাণিজ্য যেহেতু চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে হয়, তাই এই সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে বলে জানান।

ব্যবসায়ীদের বার্তা স্পষ্ট

সংবাদ সম্মেলনের শেষে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই।

তাঁর কথায়,
“আইনশৃঙ্খলা ঠিক না হলে, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ না হলে, বিনিয়োগ আসবে না। আর বিনিয়োগ না এলে কর্মসংস্থানও হবে না।”

ব্যবসায়ীদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো এখন নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

spot_img