ঢাকা — দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার পর মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৯ বছর।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, ভোরের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই তথ্য নিশ্চিত করে বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জানানো হয়, “ফজরের নামাজের পর সকাল প্রায় ৬টার দিকে খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন।” এই বক্তব্যটি মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় দলের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন তাঁর হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ে। পাশাপাশি তিনি নিউমোনিয়ায়ও আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসা সূত্রে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক জটিল রোগে ভুগছিলেন—হৃদ্রোগ, লিভার ও কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস, ফুসফুসজনিত অসুস্থতা, আর্থ্রাইটিস এবং চোখের নানা জটিলতা। তাঁর শরীরে স্থায়ী পেসমেকার ছিল এবং আগেও হৃদ্যন্ত্রে স্টেন্ট বসানো হয়েছিল।
উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে দীর্ঘ সময় অবস্থানের পর চলতি বছরের ৬ মে দেশে ফেরেন খালেদা জিয়া। এরপর থেকেই নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার নাম জড়িয়ে আছে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জনপ্রিয় ভোটে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন এবং সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনরায় চালু করেন। তাঁর সরকারের সময়েই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সূচনা হয়, যা পরবর্তী সময়ে দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৪৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া দিনাজপুরে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তাঁর বিয়ে হয় তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যুদ্ধে যোগ দেন এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি গভীর সংকটে পড়ে। সে সময় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকা খালেদা জিয়া দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং তাঁর নেতৃত্বেই দলটি স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্দোলনের সময় তাঁকে একাধিকবার আটক ও চলাচলে বাধা দেওয়া হয়। তবু তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব অব্যাহত রাখেন এবং “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৯১ সালে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে এবং ২০ মার্চ খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে স্বল্পমেয়াদে এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ ভাগ ছিল আইনি লড়াই ও তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি কারাবন্দী হন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা পেয়ে আবারও কারাগারে যেতে হয় তাঁকে। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালের ২৫ মার্চ শর্তসাপেক্ষে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়, তবে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
চলতি বছরের ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে সাজা থেকে অব্যাহতি দেন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক, আর সমালোচকদের চোখে তিনি ছিলেন সংঘাতমুখী রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া ছিলেন এক অনিবার্য নাম।
তিনি রেখে গেছেন তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান, পুত্রবধূ ও নাতনিকে। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়ায় মারা যান। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক প্রভাব ও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক যুগের অবসান ঘটল তাঁর প্রয়াণের মাধ্যমে।

