ঢাকা — ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদীর হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের ভারতে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রধান দুই অভিযুক্ত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও মেঘালয় রাজ্য পুলিশ এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। বিষয়টি ঘিরে মামলাটিতে নতুন করে কূটনৈতিক মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, জুমার নামাজ শেষে ঢাকার পল্টন এলাকায় একটি অটোরিকশায় যাত্রার সময় ওসমান হাদীকে খুব কাছ থেকে গুলি করে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বাংলাদেশ পুলিশের বক্তব্য
২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের প্রধান দুই অভিযুক্ত—ফয়সাল করিম মাসুদ ও মো. আলমগীর শেখ—বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে পালিয়ে গেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে অভিযুক্তরা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। সীমান্ত পার হওয়ার পর ‘পুর্তি’ নামে একজন তাদের গ্রহণ করে এবং পরে ‘সামি’ নামের একজনের সহায়তায় তারা মেঘালয়ের তুরা শহরে যায়।”
তিনি জানান, অভিযুক্তদের দেওয়া জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এই দাবি করা হয়েছে। একই সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, “তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী সাত থেকে দশ দিনের মধ্যেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।”
ডিএমপি জানায়, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে অভিযুক্তদের স্বজন ও কথিত সহায়তাকারীরাও রয়েছেন। পুলিশ দাবি করেছে, তদন্তের সময় অস্ত্র, গুলি, ভুয়া গাড়ির নম্বরপ্লেট এবং আর্থিক লেনদেনের কিছু নথি উদ্ধার করা হয়েছে।
ভারতের কড়া অস্বীকার
বাংলাদেশ পুলিশের এই বক্তব্যের পরপরই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দেয়।
২৮ ডিসেম্বর, মেঘালয় পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভারতের দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস-কে ফোনে বলেন,
“বাংলাদেশ পুলিশের কাছ থেকে আমরা কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বার্তা পাইনি। যাদের নাম বলা হচ্ছে, তাদের কাউকেই গারো পাহাড় এলাকায় শনাক্ত করা হয়নি এবং এ ঘটনায় কোনো গ্রেপ্তারও হয়নি।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সীমান্ত পার হয়ে অভিযুক্তদের সহায়তা করার বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের যে দাবি, সেটিরও কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। “‘পুর্তি’ বা ‘সামি’ নামে কাউকে মেঘালয়ে শনাক্ত করা যায়নি, গ্রেপ্তার তো দূরের কথা। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো সমন্বয় ছাড়াই এমন একটি বর্ণনা তৈরি করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে,” বলেন তিনি।
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফও একই অবস্থান নিয়েছে। বিএসএফ মেঘালয় ফ্রন্টিয়ারের মহাপরিদর্শক ও. পি. উপাধ্যায় ২৮ ডিসেম্বর হিন্দুস্তান টাইমস-কে বলেন, “হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে এই ব্যক্তিরা ভারতে প্রবেশ করেছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। বিএসএফের নজরদারি ব্যবস্থায় এমন কোনো ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব দাবি ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।”
ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে নিয়মিত সতর্কতার অংশ হিসেবে। তবে এটিকে বাংলাদেশের দাবির সত্যতা হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই বলেও তারা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তারা জানান, যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে কূটনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে ভারত প্রস্তুত।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বতী সরকারের আমলে ভারত বিরোধী বক্তৃতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া উগ্র বক্তব্য ও প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড এবং অশ্লিল কথাবার্তার মাধ্যমে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন হাদি। এক শ্রেণীর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছেন যথেষ্ট।
তাঁর রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কিছু এলাকায় সহিংসতা, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও ঘটে। কয়েকটি বিক্ষোভে ভারতবিরোধী স্লোগান ওঠায় দুই দেশের সম্পর্কেও বাড়তি সংবেদনশীলতা তৈরি হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিযুক্তদের অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাসের প্রতিফলন। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসন বাড়তি চাপের মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যাচাই ছাড়া প্রকাশ্যে এমন অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং সীমান্ত–সংক্রান্ত সহযোগিতাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়ে
বাংলাদেশ পুলিশ চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বললেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলায় প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করবে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক তথ্য আদান–প্রদান ও প্রমাণভিত্তিক সহযোগিতার ওপর, গণমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ওপর নয়।
এই মুহূর্তে ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়; এটি দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক আস্থা, আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

