বীণা সিক্রির সতর্কবার্তা: আওয়ামী লীগকে বাদ দিলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি সিএনএন-নিউজ১৮-কে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেছেন—আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দিলে সেই ভোট কোনওভাবেই “বাস্তব” বা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

তার মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, রাজনৈতিকভাবে একপেশে এবং ক্রমশ স্বৈরতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করছে। একই সঙ্গে দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে কঠিন সংকটে ফেলেছে।

“অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই”

বীণা সিক্রি মনে করেন, বাংলাদেশের সংবিধান যে ধরনের অন্তর্বর্তী সরকারের কথা বলে, বর্তমান সরকার তার কোথাও পড়ে না। অতীতে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য দায়িত্ব রাখত—নির্বাচন আয়োজন ছাড়া তাদের অন্য কোনো রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল না।

কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারে দেখা যাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, হেফাজতে ইসলাম ও নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি—যা পুরো ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

ড. ইউনুস নিজেই ক্ষমতার পরিবর্তনকে “মেটিকুলাসলি ডিজাইন্ড” (নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত) বলেছিলেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীর—যার বিরুদ্ধে হিজবুত তাহরীর-সংযোগের অভিযোগ আছে—নামও উল্লেখ করেছিলেন। বীণা সিক্রির মতে, এই বক্তব্যই পরিবর্তনের বৈধতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বড় ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি করে।

সহিংসতার বিচারহীনতা আরও অস্থিরতা বাড়াচ্ছে

আগস্ট ২০২৪ সালের ক্ষমতাবদলের সময় যেসব সহিংসতা ঘটেছিল সেগুলোর একটিও তদন্ত হয়নি—এ তথ্যও তুলে ধরেন বীণা সিক্রি। মারাত্মক বিষয় হলো:
• শত শত পুলিশ সদস্য নিহত,
• ৪০০-র বেশি থানায় হামলা ও লুট,
• আন্দোলনে এমন অস্ত্রের ব্যবহার—যা পুলিশের অস্ত্রাগারের নয়।

“যে দেশ তাদের শহীদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি ন্যূনতম দায় দেখায় না, সে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ”—মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ—‘গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নজিরবিহীন’

বীণা সিক্রি স্পষ্টভাবে বলেন—আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশে সরকার পতনের পরেও শাসক দলকে কখনো নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়নি—বাংলাদেশে যা করা হচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তকে সীমিত সময়সীমার মধ্যে আটকে ফেলা, সংখ্যালঘুদের ওপরে ধারাবাহিক হামলাকে তদন্তের বাইরে রাখা—এসব পদক্ষেপকে তিনি স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে

বীণা সিক্রির মতে, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও সুফি সম্প্রদায় দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছে। গত দুই সপ্তাহেই প্রায় ২,০০০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
• শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের পদত্যাগে বাধ্য করা,
• ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া,
• সাংবাদিকদের ভয় দেখানো,
• আদালত ও প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার—এসবই এখন নিয়মিত ঘটনা।

“বাংলাদেশ আজ যেন এক খোলস-বসা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র”, মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা, জামায়াতঘেঁষা ফলাফলের আশঙ্কা

নির্বাচনের সময়সীমা খোলা থাকলেও তারিখ ঘোষণা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার নানা ‘সংস্কার কমিটি’র নামে সময়ক্ষেপণ করছে—এ অভিযোগ করেন বীণা সিক্রি। ছাত্র রাজনীতিতে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতেও জামায়াত-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলোর উত্থান এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।

“সকল দলকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিলে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক না থাকলে—এ নির্বাচন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না,” তিনি বলেন।

সেনাবাহিনী দূরে থাকলেও অভ্যন্তরে টানাপোড়েন

বীণা সিক্রির মতে, সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখলেও অভ্যন্তরে স্পষ্ট টানাপোড়েন আছে। টুঙ্গিপাড়ায় এক স্থানীয় কমান্ডারের গুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যু, কিংবা মিয়ানমার সংক্রান্ত ‘হিউম্যানিটারিয়ান করিডোর’-এর মতো প্রস্তাবে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ—এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে বাহিনীও রাজনৈতিক চাপে আছে।

ওয়াশিংটনের ভূমিকা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না

শেখ হাসিনার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার অভিযোগ তুলেছে। এ বিষয়ে বীণা সিক্রি বলেন—এ অভিযোগ পুরোপুরি অমূলক নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন সহায়তার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক আছে। ট্রাম্প প্রশাসনও এই ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

বীণা সিক্রির ভাষায়—শ্রীলঙ্কা ও নেপাল আজ আবার প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে ফিরেছে, কিন্তু বাংলাদেশ একাই ব্যতিক্রম, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকার গণতন্ত্র থেকে আরও সরে যাচ্ছে।

হাসিনা ভারতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী?

বীণা সিক্রি মনে করেন, কোনো রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া শেখ হাসিনাকে ফেরানো হলে পরিস্থিতি আরও অস্থির হবে। বাংলাদেশের জনগণের বড় অংশ এখনও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রগঠনমূলক মূল্যবোধে বিশ্বাসী—এবং তারা ভারতের কাছ থেকেও সেই অবস্থান আশা করে।

জামায়াত-ই-ইসলামীর উত্থান ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরোধী—বীণা সিক্রি এই বিষয়টিকেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন।

“প্রশ্নটা এখন একজন নেতার নয়,” বলেন বীণা সিক্রি। “এটা বাংলাদেশ কী হতে চায়—আর ভারত কোন ধরনের বাংলাদেশকে সমর্থন করবে, তার প্রশ্ন।”

পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার পড়ুন এই লিংকে
spot_img