ঢাকা — বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজকে ঘিরে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতন্দ্রানু রিপা নামে এক নারী প্রকাশ্যে যে অভিযোগ তুলেছেন—তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, ভয়-ভীতি ও নারী নিপীড়নের গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।
ভিডিও বার্তাটিতে রিপা দাবি করেছেন, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে আলী রীয়াজ তার সঙ্গে দীর্ঘদিন শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। শুধু তাই নয়, তিনি জানান যে আলী রীয়াজ তাকে বলেন—তার ভ্যাসেকটমি করা আছে, তাই সম্পর্কের মাধ্যমে গর্ভধারণের সম্ভাবনা নেই। এই আশ্বাসের ভিত্তিতেই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। দু’জন দেশ-বিদেশে একসঙ্গে ভ্রমণও করেন, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতিও পান তিনি।
গর্ভধারণ, চাপ, ভয়ভীতি, শেষ পর্যন্ত গর্ভপাত
রিপার দাবি অনুযায়ী, গর্ভবতী হওয়ার খবর জানানোর পর হঠাৎ করেই রীয়াজ তাকে এড়িয়ে চলেন। এরপর রীয়াজের দীর্ঘদিনের পরিচিত দিলরুবা শারমিন তাকে ফোনে রাজি করানোর চেষ্টা করেন, গর্ভপাত না করলে ‘খারাপ পরিণতির’ হুমকিও দেন। রিপার কথায়:
“বলেছে—আওয়ামী লীগ ফিরে এলে আলী রীয়াজের বিপদ হবে, তাই এখনই বাচ্চাটা ফেলতে হবে। পরে আমেরিকা নিয়ে গিয়ে সন্তান নিতে পারবেন।”
ভয় ও চাপের মুখে রিপা ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে গর্ভপাত করাতে বাধ্য হন। গর্ভপাতের পর আলী রীয়াজ সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে তাকে তুলে নিয়ে ‘গুম-খুনের’ হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
“আমার জীবন বিপন্ন”—কান্নাজড়া কণ্ঠে রিপার আবেদন
ভিডিও বার্তায় হতাশ কণ্ঠে রিপা বলেন:
“আজ আমি রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চাই। আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমি একা। আমার জীবন ঝুঁকিতে।”
সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। লেখক-কবি-সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ নেটিজেন—অনেকেই রিপার প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে কঠোর তদন্তের দাবি তুলছেন।
সিরিজ কেলেঙ্কারি: এক নারীর অভিযোগ, আরেক নারীর বিস্ফোরণ
৩ নভেম্বর দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রীয়াজ নাকি দিলরুবা নামে এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত। বিভিন্ন রিসোর্টে তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে বলেও দাবি উঠে। রিপার ভিডিও আসার পর বিষয়টি আরও জটিল ও গভীর হয়েছে।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে গুঞ্জন রয়েছে, রিপাকে নাকি গ্রেপ্তার করা হয়েছে—যদিও সরকার এ তথ্য স্বীকার করেনি।
অধ্যাপক রীয়াজের নীরবতা, সরকারের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ সরাসরি কোনো বিবৃতি দেননি। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে—
- রিপার ভিডিও “মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”
- রীয়াজ রিপাকে “চেনেন না”
- অভিযোগগুলো “চরিত্রহননের কৌশল”
কিন্তু এই সরকারি অবস্থানও জনমনে আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে, বিশেষ করে একজন ভুক্তভোগী নারী নিজের গর্ভপাত, প্রতারণা এবং হুমকির অভিযোগ প্রকাশ্যে তুলে ধরার পর।
জনরোষ: ‘যিনি নিজের প্রেমিকাকেই প্রতারণা করেন, তিনি দেশের সংবিধান দিবেন কীভাবে?’
সামাজিক মাধ্যমে বারবার এমন প্রশ্ন উঠছে—যিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে এমন আচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত, তিনি কি ১৮ কোটি মানুষের সংবিধান সংশোধনের দায়িত্ব পালন করতে পারেন?
নিরপেক্ষ তদন্ত ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা দাবি
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কোনো নারী এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে আসা সহজ নয়। তাই অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য তারা জোর দাবি তুলেছেন।
বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির চূড়ান্ত স্পর্শকাতর এক সময়ে—অতন্দ্রানু রিপার অভিযোগ শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীর নিরাপত্তা এবং নৈতিকতার প্রশ্নে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে।

