যুক্তরাষ্ট্রে মিয়ানমারের নাগরিকদের অস্থায়ী সুরক্ষা সুবিধা শেষ

মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও মানবিক সংকট উপেক্ষা করে দেশটির নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘টেম্পোরারি প্রোটেকটেড স্ট্যাটাস’ (টিপিএস) বা অস্থায়ী সুরক্ষা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে করে প্রায় চার হাজার মিয়ানমার নাগরিক ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়বেন।

টিপিএস কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

টিপিএস এমন একটি মানবিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয় না এবং যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। কোনো দেশে যুদ্ধ, সামরিক দমন-পীড়ন, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৃহৎ ধরনের সংকট চললে যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশের নাগরিকদের অস্থায়ী এই সুরক্ষা দেয়।

২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ, দমন-পীড়ন এবং অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের নির্মম রূপ দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের টিপিএস দেয়। তিন বছর পর এসে সেই সুরক্ষা তুলে নেওয়ার ঘোষণায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম দাবি করেছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে “কিছু উন্নতি হয়েছে”—বিশেষত জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, দেশে আংশিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং তাই টিপিএস অব্যাহত রাখার প্রয়োজন নেই।

তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, মিয়ানমারে এখনো “সামরিক অভিযান এবং মানবিক সংকট অব্যাহত আছে”, বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো সংঘাতে জর্জরিত।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এ সিদ্ধান্তকে “বাস্তবতা অস্বীকার” বলে মন্তব্য করেছে। সংস্থাটির এশিয়া বিভাগের পরিচালক জন সিফটন বলেন, জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার সরকারি ঘোষণা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে দেশজুড়ে নতুন করে জরুরি অবস্থা ও সামরিক আইন জারি করা হয়েছে বহু শহর ও অঞ্চলে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক আরও কঠোর মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষায়, “মিয়ানমারে বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন’—বলা যায় না, কল্পনাই করা অসম্ভব।”

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—যে দেশে ব্যাপক এলাকা সামরিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে, যেখানে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বন্দুকের মুখে মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে, সেখানে নির্বাচন আয়োজন মানেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে প্রহসন করা।

একটি বিধ্বস্ত দেশ

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার কার্যত বহু-মুখী গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থী গেরিলা গোষ্ঠী, ছাত্র সংগঠন ও শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ক্রমাগত অগ্রসর হচ্ছে। সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে দেশের বহু অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

অং সান সুচি ও তাঁর দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)—যারা ২০২০ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছিল—তাদের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, দল বিলুপ্ত ঘোষণা এবং হাজারো মানুষকে কারাবন্দি করার বাস্তবতায় কোনো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই আন্তর্জাতিক মহল বৈধ মনে করছে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এখনো মিয়ানমারকে ভ্রমণঝুঁকির সর্বোচ্চ সতর্ক তালিকায় রেখেছে। সেখানে যাওয়ার ঝুঁকির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—“গৃহযুদ্ধ, সশস্ত্র সংঘাত, অবৈধ আটক, এবং নাগরিক নিরাপত্তার সম্পূর্ণ ভঙ্গুরতা।”

অভিবাসন নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক কঠোরতা

টিপিএস থেকে মিয়ানমারকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বিচ্ছিন্ন নয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে আফগানিস্তান, ক্যামেরুন, হাইতি, হন্ডুরাস, নেপাল, নিকারাগুয়া, সিরিয়া, দক্ষিণ সুদান, ভেনেজুয়েলা ও সোমালিয়ার টিপিএস-সুরক্ষাও তুলে নিয়েছে।

অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলো বলছে—এটি রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত সিদ্ধান্ত, যা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হাজারো পরিবারকে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে। মিয়ানমারের বর্তমান দুঃসহ বাস্তবতায় কাউকে সে দেশে ফেরত পাঠানো “জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করবে”—বলে মন্তব্য করেছে বিভিন্ন গ্রুপ।

আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের যুক্তি, মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনো স্পষ্টভাবেই টিপিএস প্রদানের সব শর্ত পূরণ করে।

মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র যেমন ভয়াবহ, তেমনি অনিশ্চিতও। পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হওয়ার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত সেই চার হাজার মানুষকে শঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার নতুন অধ্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে।

এখন দেখার বিষয়—মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং আদালতের সম্ভাব্য রায় কি এই সিদ্ধান্তকে স্থগিত করতে পারে, নাকি হাজারো মানুষকে সত্যিই ফিরতে হবে এক বিধ্বস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে।

spot_img